Skip to main content

গুপ্ত যুগকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণময় যুগ বলা যায়? এর সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।

গুপ্ত যুগকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণময় যুগ বলা যায়? এর সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।(West Bengal State University, 2nd Semester History Minor Syllabus)


ভূমিকাঃ

      আলোচনা শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে কুষান ও সাতবাহন বংশের পর অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। অসংখ্য স্থানীয় রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল ঠিক সেই সময়। আর এর সংকটময় মুহূর্তে গুপ্ত রাজগণের আবির্ভাব ঘটে। অতঃপর প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ৩১৯ থেকে ৩২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন। বলা যায় তাঁর শাসনকাল থেকে গুপ্ত যুগ শুরু হয়। আর  আনুমানিক ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন হয়। এই সময়ে গুপ্ত রাজাদের অধীনে ভারতবর্ষে সাহিত্য, শিল্প, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। আর সেখানে আমরা দেখি-

১) গুপ্ত যুগের সভ্যতার বিকাশঃ

          গুপ্তদের শাসনকালে সাধারণত স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয়। কারণ শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই নয় বৈদেশিক দিক দিয়েও গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষে সাহিত্য, শিল্প, ভাস্কর্য,সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব উন্নতির লক্ষ্য করা যায়। তবে এই উন্নয়ন অনেকের মতে বৈদেশিক যোগাযোগের ফলে সম্ভব হয়েছিল তা সঠিক নয়।গুপ্ত রাজগণ দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপন করেছিলেন। তারা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজেদের পৃষ্ঠপোষক রূপে চিহ্নিত করেছিলেন ধর্মীয়তার পরিচয়ও দিয়েছিলেন। ফলে তাদের আমলের প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতি উন্নতির এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

২) গুপ্ত রাজাদের সাম্রাজ্য বিস্তারঃ

         গুপ্ত সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে লিচ্ছবি রাজবংশের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। অতঃপর তিনি লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমার দেবীকে বিবাহ করেন। এইভাবে বৈশালীদের সঙ্গে গুপ্তদের সম্পর্কের উন্নতি হয়। চন্দ্রগুপ্ত সমগ্র আর্যাবর্তে গুপ্তদের আধিপত্য স্থাপন করেন। তাঁর পরবর্তী রাজা সমুদ্রগুপ্তের কৃতিত্ব এলাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, তিনি দ্বিগবিজয় ও ধর্ম বিজয় নীতি অনুসরণ করেন। তবে-

           চন্দ্রগুপ্ত বুঝতে পেরেছিলেন যে, উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের মতো বিস্তৃত পরিধি নিজে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না। তাই তিনি উত্তর ভারতের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করেন এবং দক্ষিণ ভারত থেকে তিনি আনুগত্য লাভ করেই সন্তুষ্ট থাকলেন। এছাড়াও বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে খুব সুসম্পর্ক রেখে এগিয়ে চললেন। তবে তার পরবর্তী শাসক দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত পিতার রাজ্য অক্ষুন্ন রেখে শকদের পরাস্ত করে পশ্চিম ভারতের নিজের আধিপত্য স্থাপন করেন। কিন্তু পরবর্তী  রাজা স্কন্দগুপ্ত হূণ আক্রমণ প্রতিহত করেন বটে কিন্তু তারপরেই শুরু হয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন।

৩) গুপ্ত শাসন ব্যবস্থাঃ 

             গুপ্ত সম্রাটরা স্কুথিয়ার রাজার অনুকরণে এক কেন্দ্রীয় ও শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন । তাঁরা বিক্রমাদিত্য, অচিন্ত্যপুরুষ,লোকাধামদেব প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। আর তাদের আমলে প্রাদেশিক ও গ্রামীণ শাসন ব্যবস্থা ছিল বেশ উন্নততর পথে অগ্ৰসর হতে থাকে। তবে সেই সাথে ছিল দেশের মধ্যে শান্তিশৃঙ্খলা এবং সাথে সাথে প্রশস্ত হয় সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ।

৪) শিল্প ও সাহিত্যঃ

           গুপ্ত যুগে শিল্প স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।বুদ্ধের অসাধারণ সৌন্দর্যপূর্ণ মূর্তি, হাতে চক্র নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের যা সারনাথ থেকে সারা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল তা সৌন্দর্যের দিক থেকে অসাধারণ ছিল। বলা যায় বহু যুগের বিবর্তনের ফলে গুপ্তযুগে শিল্প সম্পূর্ণতা লাভ করেছিল। মথুরা ও সারনাথ ছিল গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যের দুটি রত্নখনি স্বরূপ। তবে গুপ্ত যুগে শিল্পের মধ্যে বাঘ, অজন্তার বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে অজন্তা গুহা শিল্প অনেক নষ্ট হয়ে গেলেও যেটুকু আছে তার মধ্যে বুদ্ধের ও জাতকের কাহিনী অবলম্বনে চিত্রগুলি সৃষ্টির চরম উৎকর্ষতার উদাহরণ বলা যায়।

৫) সাহিত্যের বিকাশঃ

            গুপ্ত যুগে সাহিত্যের পরিপূর্ণতা এবং বিকাশ বিশ্ব সাহিত্যকে আজ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করে রেখেছে। কালিদাস প্রণীত কুমারসম্ভব, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্  রঘুবংশম্  মেঘদূত ইত্যাদি বিশ্ব সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। এছাড়াও ভারবীর কিরাতার্জুনীয় বিশেষ উল্লেখযোগ্য এবং বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস কালজয়ী সাহিত্য ভাল বিবেচিত। আর এই সকল সাহিত্যসম্ভার গুপ্ত যুগকে সমৃদ্ধ করেছিল বলা যায়।

৬) চিকিৎসা শাস্ত্রঃ

           গুপ্ত যুগের অন্যতম বিখ্যাত চিকিৎসক বাগভট্ । পশু চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থ হস্তয়ুর্বেদ গ্রন্থটি এই যুগে পশু চিকিৎসার শাস্ত্রের মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। এছাড়াও অপর একটি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় সেটি হলো অশ্বশাস্ত্র। তবে চিকিৎসা শাস্ত্রের মধ্যে ধন্বন্তরি, কাত্য, বররুচি, বাচস্পতি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়, যেগুলি সে যুগে চিকিৎসা শাস্ত্রে উন্নতিতে অভূতপূর্ব ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

৭) ধর্মীয় অবস্থাঃ

           গুপ্ত যুগে ধর্মেরও ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল।আসলে গুপ্ত যুগ ছিল প্রধানত হিন্দু ধর্মের বিকাশ সাধনের যুগ। পুষ্যমিত্র শুঙ্গের চেষ্টায় হিন্দু ধর্মের যে পুনরুত্থান ঘটেছিল তার চরম বিকাশ ঘটে গুপ্ত যুগে।তবে গুপ্ত রাজাগণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও গুপ্ত যুগে হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেরও বিকাশ ঘটেছিল।

৮) ব্যবসা-বাণিজ্যঃ 

         গুপ্ত যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যের ও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল।এই যুগে বহির্বিশ্বের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে। চীনের সাথেও ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র ধরে ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্তার লাভ ঘটেছিল।

সীমাবদ্ধতাঃ

        সম্প্রতি বহু ঐতিহাসিক গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলে গণ্য করতে রাজি নয়। তাঁদের যুক্তি হলো গুপ্ত সভ্যতা ও সংস্কৃতি ছিল সমাজের উপর তলার লোকের জন্য সৃষ্টি। নিম্ন শ্রেণীর লোকের সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। সমাজে নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছিল।গুপ্ত যুগের সাহিত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা প্রভৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটলেও সমাজ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবক্ষয় লক্ষ্য করার গিয়েছিল।

            পরিশেষে বলা যায় যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগের বেশ কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও গুপ্ত যুগের অনন্য অগ্রগতিকে অস্বীকার করা যাবে না। বিভিন্ন অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা, ধর্ম প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগ যে সুবর্ণ যুগ হয়ে উঠেছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আর্থ-সামাজিক বিচারে গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা বোধ হয় ঠিক হবে না।


ঠিক এরূপ অসংখ্য নোটসের আলোচনা, ভিডিও ও সাজেশন পেতে ভিজিট করুন আমাদের "SHESHER KOBITA SUNDORBON" ইউটিউব চ্যানেলে, ধন্যবাদ 🙏)

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...