Skip to main content

মেঘনাথবধ কাব্যের ষষ্ঠ স্বর্গের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো(West Bengal State University, Bengali, 4th. Semester, Major Course)DS-7

        আমরা জানি মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের মূল পটভূমি হল 'রামানুজ কর্তৃক মেঘনাদবধ।' আর সেখানে কাব্যকার মধুসূদন দত্ত এই ষষ্ঠ স্বর্গের সমাপনীতে  লিখলেন-

   "ইতি মেঘনাদবধে কাব্যে বধো নাম ষষ্ঠ সর্গ"

     এখন আমাদের বিচার করতে হবে যে,মেঘনাথবধ কাব্যের ষষ্ঠ স্বর্গের এই নামকরণ কতটা যথার্থ। সেই আলোচনায় আমরা প্রথমেই বলতে পারি--

              মেঘনাথ বধের ষষ্ঠ সর্গই সমস্ত কাব্যের মধ্যে একটি উৎকৃষ্ট অন্যতম সর্গ। কারণ রক্ষ বংশের প্রতি কবির অত্যাধিক সহানুভূতি ছিল। শুধু তাই নয়, এখানে বাল্মিকীকে পরিত্যাগ করে কবি হোমারকে আদর্শরূপে গ্রহণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আর তার প্রধান কারণ হলো, কবি মধুসূদন রক্ষবীরদের বীরত্বে এমনই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাদের প্রতিপক্ষকও যে বীর, সে কথা তিনি একেবারেই ভুলে গেছেন। তবে আমরা বলতে পারি,এটি তাঁর প্রবল ধর্মবিশ্বাস ও ভ্রমের অপর কারণ। তবে জাতীয় ধর্মের প্রতি বিশ্বাস বা আস্থা থাকলে কবি কখনোই এরূপ নিকৃষ্ট ঘটনা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারতেন না। সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে তাঁর ষষ্ঠ স্বর্গ অনুসারে আমরা বলতে পারি-

              রামানুজ লক্ষণ দৈবাস্ত্র বর লাভ করে রামের কাছে এই বর কিভাবে তিনি পেলেন তা বর্ণনা করেন। প্রসঙ্গত তিনি রামচন্দ্রকে আরোও জানান যে, লঙ্কার অধিষ্ঠাত্রী দেবী চণ্ডী বলেছেন দেবতারা সকলেই তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন। স্বয়ং ইন্দ্র দৈবাস্ত্র পাঠিয়েছেন। যে অস্ত্রগুলি নিয়ে বিভীষণের সাথে লক্ষণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগৃহে প্রবেশ করে মেঘনাদকে বধ করবেন। দেবী চণ্ডী আরো বলেন, তাঁর কৃপায় তাঁরা অদৃশ্য ভাবে যজ্ঞশালায় প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু-

         রামচন্দ্র বিচলিত হয়ে বলেন যে, ঠিক শত্রু ভয়ে দেব নর সকলেই ভীত। এরূপ অবস্থায় তিনি কিভাবে লক্ষণকে পাঠাবেন। পাশাপাশি তিনি আরও ভাবতে থাকেন সীতা উদ্ধারের জন্য বৃথা চেষ্টা করে আর লাভ নেই। তিনি রাজ্য পিতা মাতা আত্মীয়-স্বজন সকলকে হারিয়েছেন। সাথে ছিল সীতা, সেও আজ রাবণ কর্তৃক অপহৃত। এরূপ অবস্থায় লক্ষণকে যদি হারাতে হয় তাহলে যুদ্ধে আর কাজ নেই! তবে রামচন্দ্রের এই আক্ষেপ দুর্বল চিত্তের যে পরিচয় পাওয়া যায় সেটি স্বাভাবিক। তবুও লক্ষণ দাদাকে বলেন-

  "দেবতার যেখানে সহায় সেখানে এই খেদ অনুচিত।"

       তাই আজ যদি তিনি দাদার অনুমতি পান, আদেশ পান তাহলে লঙ্কায় প্রবেশ করে মেঘনাদকে বধ করতে সমর্থ হবেন। শুধু তাই নয়, দেবতাদের ইচ্ছার বিরোধিতা ঠিক এই সময় করা ঠিক হবে না। পাশাপাশি বিভীষণ রামচন্দ্রকে বলেন যে, স্বপ্নে দেবী তাঁকে আদেশ দিয়েছেন মেঘনাদকে বধ করতে লক্ষণকে সাহায্য করার জন্য। তবু রামচন্দ্র আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ঠিক এমন সময়ে রামচন্দ্র দৈববাণী শুনলেন-

        'দেবাদেশ অবহেলা করা অনুচিত।'

        অতঃপর রামচন্দ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে,সাপ আর ময়ূরের এক যুদ্ধ বেঁধেছে।যে যুদ্ধে ময়ূরের মৃত্যু হয়, তখন সাপ গর্জন করতে লাগলো। যার ব্যাখ্যা বিভীষণ দিলেন,সাপের কাছে সর্পভক্ষক ময়ূরের মৃত্যু হয়েছে, যার অর্থ হল লক্ষণের হাতে মেঘনাদের মৃত্যু হবেই। অতঃপর --

                রামচন্দ্র কিছুটা আস্বস্ত হলেন এবং লক্ষণকে দৈবাস্ত্রে তিনি নিজে হাতেই সাজিয়ে দিলেন। অতঃপর লক্ষণ বিভীষণের সাথে দ্রুত অদৃশ্যভাবে যাত্রা শুরু করেন। এখানে আশ্চর্যভাবে দেখা গেল যে, লক্ষণ লঙ্কায় প্রবেশ করতেই মায়াবলে লঙ্কার সিংহদ্বার খুলে যায়, কিন্তু কেউ শব্দ শুনতে পেল না। শুধু তাই নয়, কেউ তাদেরকে দেখতেও পেল না। অতঃপর তাঁরা নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে গিয়ে দেখলেন মেঘনাদ সেখানে ধ্যানে মগ্ন। আর এই সুযোগে লক্ষণ অস্ত্র বের করলে তার শব্দে মেঘনাদের ধ্যান ভঙ্গ হয়। মেঘনাথ মনে করলেন যে, লক্ষণের রূপ ধরেই অগ্নিদেবতা তাঁর কাছে এসেছেন। তবুও মেঘনাদ তার আবির্ভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আর লক্ষণ তাঁর আত্মপরিচয় দিয়ে দেব অসি কোষমুক্ত করে মেঘনাদকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন। ঠিক সেই সময় মেঘনাদ লক্ষণকে জানালেন-

  "যদি সত্যিই তাঁর যুদ্ধে সাধ জাগে তা পূর্ণ করবেন।

    কিন্তু নিরস্ত্রকে আক্রমণ করা বীরধর্ম নয়।"

     অতঃপর লক্ষণ মেঘনাদকে জানালেন, তিনি শত্রু বধ করার জন্যই এখানে এসেছেন। তাই রাক্ষসের সাথে ক্ষাত্রধর্ম পালন অর্থহীন। তখন লক্ষণের এহেনও কথা শুনে মেঘনাদ তীব্রভাবে নিন্দা প্রকাশ করার সাথে সাথেই পূজার কোষা দিয়ে লক্ষণকে আঘাত করলেন। সেই আঘাতে লক্ষণ  মুর্ছিত হয়ে পড়লেও তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে পারলেন না। তখন মেঘনাদ ভাবলেন এসবই দেবতাদের ষড়যন্ত্র। অতঃপর মেঘনাদ দরজার পাশেই দেখলেন কাকা বিভীষণকে। আর তখনই মেঘনাথ বুঝতে পারলেন যে, লক্ষণ কিভাবে এই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করেছে। মেঘনাদ সবকিছু জানতে পেরে বিভীষণের প্রতি নিন্দা প্রকাশ করে অস্ত্রাগারের পথ ছেড়ে দিতে বললেন। আর তিনি পারলে তবে লক্ষণের সাথে তিনি যুদ্ধ করতে পারবেন। কিন্তু বিভীষণ রামচন্দ্রের দাস হওয়ার কারণে এ কাজ করতে পারবেন না তা মেঘনাদকে জানিয়ে দিলেন। অতঃপর বিভীষণ বিভীষণ মেঘনাদকে জানালেন যে---

   "রাবণের পাপের জন্য লঙ্কা আজ ধ্বংস হতে চলেছে।"


      অতঃপর আমরা আশ্চর্যভাবে লক্ষ্য করলাম যে, দৈব মায়ার কারণে লক্ষণ চেতনা ফিরে পেলেন এবং লক্ষণ মেঘনাদকে তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ করতে লাগলেন। শর বিদ্ধ মেঘনাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং এক অস্থিরময় বেদনার মধ্যে তিনি একের পর এক পূজা পাত্র লক্ষণের দিকে নিক্ষেপ করলে তা মায়ার প্রভাবে লক্ষণের শরীরে আঘাত করতে পারে না। তবুও মেঘনাদ লক্ষণের দিকে এগিয়ে যেতে লক্ষ্য করলেন যে, দেবতারা তাকে আড়াল করে রাখছে। এমন দৃশ্য দেখে মেঘনাদ হতাশার মধ্যে ডুবে গেলেন। ঠিক এমন সুযোগে লক্ষণ দৈব অসি দিয়ে মেঘনাদকে বধ করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং অতঃপর মেঘনাদের মৃত্যু হয়! আর তখনই কাব্যকার মধুসূদন দত্ত জানান--

       "লঙ্কার পঙ্কজ রবি গেলা অস্তাচলে।"

      আর এখানেই মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের নামকরণের সার্থকতা- "ইতি শ্রীমেঘনাদ বধে কাব্যে বধো নাম ষষ্ঠঃ সর্গঃ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher Kabita Sundarbon YouTube channel SAMARESH SIR 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...