রম্যরচনা কাকে বলে? রম্য রচনার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর DD5, Unit 2.
আমরা জানি যে,রম্য রচনা' কথাটির অভিধানিক অর্থ হলো, যে রচনা রমণীয় বা সুন্দর। আর এই অর্থে রম্য রচনার এই সংজ্ঞাটি অতি ব্যাপক। কারণ হিসেবে আমরা বলতে পারি যে-
সাহিত্যের ধর্মই এই যে, তা রমণীয় ও সুন্দর হবে, হবে রসোত্তীর্ণ। আর এই অর্থে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ—সকল শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহকেই রম্য রচনা অভিধায় ভূষিত করতে পারি। তবে ‘রম্য রচনা’ কথাটির এই ব্যাপক অর্থ স্বীকার করেও, বিশেষ অর্থে রম্য রচনা বলতে আমরা এক বিশেষ রচনারীতিকেই বুঝে থাকি। আর সেখানে বলা যেতে পারে-
যে রচনায় জীবনের লঘু-চপল বিকাশগুলিকে নিয়ে উচ্চতর সারস্বত কর্মে নিয়োজিত করা হয়, সেই রচনাই রম্য রচনা।
•রম্যরচনার বৈশিষ্ট্য •
•প্রথমতঃ হালকা বৈঠকি চালে, ঘরোয়া মেজাজে, লঘু হাস্যরসাত্মক, রম্য কল্পনার স্পর্শযুক্ত যেকোনো গদ্য রচনাকেই রম্য রচনা বলা যায়।
•দ্বিতীয়তঃ রবীন্দ্রনাথের মতে, রম্য রচনা হলো-বাজে কথার রচনা। যেখানে অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচের মানুষকে যথার্থ চেনা যায়। কারণ মানুষ ব্যয় করে বাধা নিয়ম অনুসারে।আর অপব্যয় করে নিজের খেয়ালে। যেমন বাজে খরচ তেমনি বাজে কথাতেই মানুষ আপনাকে ধরা দেয়। এই মন্তব্যের আলোকে দেখলে স্বচ্ছন্দ, নির্ভয়, খেয়ালী কল্পনায় সর্ববন্ধন মুক্ত রম্যতাই এ জাতীয় রচনা চরিত্র লক্ষণ।
•তৃতীয়তঃ ভার বর্জনের প্রয়াস যেমন থাকবে ভাষা ও আঙ্গিকে, তেমনই থাকবে বিষয়েও। কোন গভীর তত্ত্বকথা প্রকাশের তাগিদ বা পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের বাসনা যেমন থাকবে না, ভাষাভঙ্গি তেমনি সচ্ছন্দ স্বাধীন গতিতে চলবে কোন স্থির অনুশাসনের পরোয়া না করে।
চতুর্থতঃ লেখক ও পাঠকের নিবিড় সান্নিধ্য লঘু ও সরস আড্ডাই রম্যরচনা প্রাণ। তবে মজলিসি মেজাজ না থাকলে এ রচনার উপভোগ্যতাই হারিয়ে যায়।
•একটি সার্থক রম্য রচনা: ‘বিড়াল’ (কমলাকান্তের দপ্তর)•
•বাংলা সাহিত্যে রম্য রচনার আলোচনা করতে গেলে যে কালজয়ী সৃষ্টির নাম সবার আগে উঠে আসে, তা হলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। এই গ্রন্থের অন্তর্গত ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি একটি সার্থক ও শ্রেষ্ঠ রম্য রচনার নিদর্শন। রম্য রচনা বা ‘বেল-লেতর’ (Belles-Lettres) হলো সেই সাহিত্য যেখানে তথ্যের চেয়ে রসের এবং পাণ্ডিত্যের চেয়ে লেখকের ব্যক্তিগত মেজাজ ও রসবোধের প্রাধান্য থাকে। ‘বিড়াল’ রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র হাস্যরসের আধারে অত্যন্ত গভীর এক সমাজতাত্ত্বিক সত্য পরিবেশন করেছেন। তবে এখানে আমাদের আলোচনা করে দেখাতে হবে- ‘বিড়াল’-কে কেন রম্য রচনা হিসেবে গণ্য করা হয়, তার কারণগুলি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
•রম্য রচনার প্রধান শর্ত হলো লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে লেখক নিজেকে ‘কমলাকান্ত’ নামক এক আফিমখোর চরিত্রের আড়ালে স্থাপন করেছেন। নসীবাবু ও কমলাকান্তের কথোপকথন এবং মার্জারীর (বিড়াল) সঙ্গে তাঁর কাল্পনিক বিতর্কটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিনিষ্ঠ। গম্ভীর কোনো গবেষণামূলক প্রবন্ধের মতো এখানে কোনো নির্মোহ বিশ্লেষণ নেই, বরং এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জবানিতে পুরো কাহিনিটি এগিয়েছে।
•একটি সার্থক রম্য রচনা পাঠককে হাসাতে হাসাতে ভাবিয়ে তোলে অর্থাৎ সেখানে থাকবে হাস্যরস ও সূক্ষ্ম কৌতুক । ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে দেখি, কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধ একটি বিড়াল খেয়ে ফেললে লেখক তাকে লাঠি নিয়ে মারতে উদ্যত হন। কিন্তু বিড়ালটি ভয় না পেয়ে মানুষের মতো কথা বলতে শুরু করে। বিড়ালের যুক্তি-
“অধিকারি চতুষ্পদ বলিয়া কি আমার ক্ষুধা নাই?”-
এই ধরণের সংলাপের মধ্যে যে কৌতুক ও বুদ্ধির দীপ্তি (Wit) রয়েছে, তা রম্য রচনার শ্রেষ্ঠ অলংকার।
•সার্থক রম্য রচনা কেবল তরল হাসি নয়, তার গভীরে থাকে এক গভীর জীবনদর্শন। ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে বিড়ালের মুখ দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন সমাজের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তুলে ধরেছেন। বিড়ালটি যখন বলে-
“চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণে দোষী,”
তখন হাস্যরসের আবরণ ভেদ করে সাম্যবাদের এক প্রখর সত্য বেরিয়ে আসে। এই যে হাসির মোড়কে কষাঘাত করার শিল্পগুণ, এটিই একে সার্থক রম্য রচনা হিসেবে সার্থকতা দান করে।
•রম্য রচনার ভাষা হতে হয় সাবলীল ও ঘরোয়া। ‘বিড়াল’ প্রবন্ধের ভাষা অত্যন্ত সজীব। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে কোনো সংস্কৃতঘেঁষা গুরুগম্ভীর গদ্য ব্যবহার না করে অনেকটা আড্ডার মেজাজে গদ্যকে সাজিয়েছেন। কমলাকান্তের বিচারবুদ্ধি এবং বিড়ালের অভাবনীয় যুক্তিতর্ক এক অনন্য গদ্যরীতি তৈরি করেছে, যা পাঠককে এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত করে না।
•রম্য রচনায় যুক্তির চেয়ে ভাবের ডানা মেলার স্বাধীনতা থাকে বেশি। কমলাকান্ত দুধ খেয়ে ফেলা বিড়ালের পিছু ধাওয়া করতে করতে হঠাৎ করে সমাজবিজ্ঞান ও ন্যায়শাস্ত্রে প্রবেশ করেন। এই যে এক ভাব থেকে অন্যভাবে অনায়াস বিচরণ, এটিই রম্য রচনার বৈশিষ্ট্য। বঙ্কিমচন্দ্র কোনো তত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যে কলম ধরেননি, বরং রসের আধারে সত্যকে ধরতে চেয়েছেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিড়াল’ কেবল একটি হাসির গল্প নয়; এটি সমাজ-অসঙ্গতির এক রসসিক্ত দলিলায়ন।যেখানে যুক্তির কঠোরতা নেই, কিন্তু শ্লেষের ধার আছে; তথ্যের ভার নেই, কিন্তু সত্যের জ্যোতি আছে-সেখানেই রম্য রচনার সার্থকতা। আর এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি- ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি তার গঠনশৈলী, রসবোধ এবং মানবিক আবেদনের কারণে বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ ও সার্থক রম্য রচনা হিসেবে স্বীকৃত।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ডিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং Shesher kabita Sundarban YouTube channel, SAMARESH sir
Comments
Post a Comment