Skip to main content

ঔপন্যাসিক সূর্যকান্ত (6th. Semester) ত্রিপাঠী নিরালায় প্রতিভার পরিচয় দাও।

ঔপন্যাসিক রূপে সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালার প্রতিভার পরিচয় দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়,  ষষ্ঠ সেমিস্টার, বাংলা অনার্স)।

আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হলেন সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী। মূলত তিনি কবি হয়েও ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আসলে তিনি গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নকশা ধর্মী রচনায় ছিলেন একেবারেই সিদ্ধহস্ত। আসলে পশ্চিমবঙ্গের শস্য শ্যামলা কোমল মৃত্তিকাতেই নিরালার কৈশোর ও যৌবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হওয়ার ফলে বাংলা সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ। তবে -

মহিষাদলের রাজপ্রাসাদে থাকাকালীন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন সমাজের আর্থিক বৈষম্য এবং অনাচার। আর সেই বৈষম্য এবং অনাচার দেখে কিষান ও মজুরদের নিয়ে তিনি সংগঠন করেছেন। শুধু তাই নয়,অন্যায, অবিচার ও ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন। যে আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন। আর এখান থেকে তাঁর সাহিত্যের উপর পশ্চিমবঙ্গের এক বিশাল প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যেখানে তিনি নিরালার কবিতা সূত্রপাত মুক্তবন্ধ ছন্দে রচনা করলেন। নিরালার প্রথম রচনা 'জুহী কি কলী' হিন্দি সাহিত্যাঙ্গনে যেটি প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। আসলে-

         সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ওরফে নিরালা হিন্দি সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য লেখক। যিনি একাধারে কবি, ছোট গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক ছিলেন। হিন্দি সাহিত্যের ছায়াবাদ যুগের প্রতিনিধি স্থানীয় কবি নিরালা উপন্যাস রচনাতেও তাৎপর্যপূর্ণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। শৈশবে কিছুকাল মেদিনীপুরে মহিষাদলে থাকতে হয়।আর সেখান থেকে শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার বিশেষ করে হিন্দি ও বাংলা চর্চায় মগ্ন থাকেন। আর এই মগ্ন থাকার ফলে তাঁর মনে স্বাভাবিকভাবে বঙ্গ সংস্কৃতি প্রভাব ফেলেছিল। অতঃপর তিনি রচনা করলেন বেশ কয়েকটি উপন্যাস। আর সেই উপন্যাস গুলি হলো-

        অপ্সরা (১৯৩১), অলকা (১৯৩৩), নিরুপমা ( ১৯৩৬), প্রভাবতী (১৯৩৬), চেটি কি পকড় (১৯৪৬), কালে কারণামে(১৯৫০), ইন্দুলেখা (১৯৮২), চামেলী (১৯৮২)

          আসলে নিরালার সাহিত্য মননটিকে পুষ্ট করেছিল সেদিন বিংশ শতাব্দীর নানা ভাবনা চিন্তার তরঙ্গ। তাই তার উপন্যাস গুলিতে আমরা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবনা দেখতে পাই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে, সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী অত্যন্ত বাস্তববাদী ছিলেন। তাই তাঁর উপন্যাসগুলিতে সেই বাস্তববাদের রূপালেখ্য আমরা দেখতে পাই। আর এই দৃষ্টিতে তাঁর উপন্যাসগুলি পর্যালোচনা করলে ঔপন্যাসিক নিরালা র যে বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই সেগুলি হলো- 

প্রথমতঃ নিরালার উপন্যাসে হিন্দি সাহিত্যে নব বাস্তববাদের জন্ম দিয়েছিল। নতুন সমাজ গঠনে ভিত্তিভূমি গড়ে উঠে।

দ্বিতীয়তঃ মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দর্পণে জীবন পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরালার উপন্যাস স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিল। যেখানে মনস্তত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্ব তাঁর উপন্যাসে প্রাধান্য বিস্তার করে।

তৃতীয়তঃ ব্যক্তির আত্ম অভিব্যক্তির দর্পনে, সামাজিক তরঙ্গ গুলির সাথে ব্যক্তির সংঘর্ষের ফলে নিরালার উপন্যাস কাব্যিক ফ্যান্টাসি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। যেখানে-

'অপ্সরা' উপন্যাসে নিরালা ঃ অপ্সরা উপন্যাসটি কনক ও রাজকুমারের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই, রাজকুমার ও তার বন্ধু চন্দনের বিপ্লবী চেতনা ও সমাজ ভাবনাকে কেন্দ্র করেই দ্বান্দ্বিক সংঘর্ষই এই উপন্যাসের কাহিনী কেন্দ্র। সেখানে রাজকুমারের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন মুখ্য হয়ে ওঠে এবং সেটি রাজকুমারকে কল্পনার জগত থেকে বাস্তব জগতে বিচরণ করায়। তবে কনকের সংস্পর্শে রাজকুমার বিপ্লবী চেতনা বা সংগ্রামী সংকল্প তার মন থেকে মুছে ফেলে। অতঃপর বন্ধু চন্দনের গ্রেফতরের খবর খবর জানতে পেরে রাজকুমার সকল প্রকার মোহজাল ছিড়ে বাস্তব মাটিতে পদার্পণ করে।

নিরুপমা উপন্যাসে নিরালাঃ নিরুপমা উপন্যাসের মূল বিষয় নিরপমা ও কুমারের প্রেম পরিণয়। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই কুমার লন্ডন থেকে ডিলিট উপাধি বা ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে কিন্তু এই কুমার চাকরি না পেলেও নিরুপমার আসমুদ্র প্রেম পেয়েছে। যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী যামিনীহরণ সেই প্রেমের কাছে পরাজিত হয়েছে। আর জমিদার কন্যা নিরুপমার সঙ্গে তাদেরই প্রেম পরিণতিতে যে সমস্যা ও দ্বন্দ্ব ছিল তা কিছুটা ঘাটতি হয়েছে বলা যেতে পারে।

প্রভাবতী উপন্যাসে নিরালা ঃ প্রভাবতী  উপন্যাসটি সূর্যকান্ত ত্রিপাঠীর উল্লেখযোগ্য একটি অন্যতম উপন্যাস। ঐতিহাসিক বিষয়কে অবলম্বন করেই এই উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। যেখানে বিষয়ের কেন্দ্রে আছে-পৃথ্বীরাজ জয়চন্দ্রের সময়কার উত্তর ভারতের রাজাদের সংঘর্ষের কাহিনী। তবে এখানে এ ঔপন্যাসিককে আমরা সমালোচকের ভূমিকায় দেখি। যেখানে-

    উপন্যাসে আমরা দেখি তৎকালীন সময়ে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিলাসময় জীবনযাত্রা। যে জীবনযাত্রায় নিরালা বেত্রহস্ত। তবে উপন্যাসে দেখানো হয়েছে নবযুগের নারী জাগরণের মহিমা। যে মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে প্রভাবতী আত্মমর্যাদা রক্ষা করার তাগিদে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প গ্রহণ করে। 

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ঔপন্যাসিক নিরালা বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক। তাই তাঁর প্রতিটি রচনায় আমরা পাই বাস্তবধর্মিতা। আর সেখানে উপনিবেশ বিরোধী এবং সামন্ততন্ত্রবিরোধী জীবন ভাবনা তাঁর উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়।সেখানেই তাঁর উপন্যাসের জীবন কথা হয়েছে জীবন সংগ্রামের ভাষা। যা হাস্য,ব্যঙ্গ সম্পৃক্তময়। যেখানে এ ঔপন্যাসিককে গভীর দুঃখের সাথে হাস্যপরিহাস ব্যঙ্গের মিশ্রণে যথার্থ জীবন রসিক ঔপন্যাসিকে উন্নীত করেছে।

(ঠিক এরূপ অসংখ্য নোটস্ ,আলোচনা ,ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের 'SHESHER KOBITA SUNDARBAN' Youtube channel)



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...