Skip to main content

নবনীতা দেব সেনের ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে হে পূর্ণ তব চরণের কাছে গ্রন্থটির রচনারীতি বৈশিষ্ট্য নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

নবনীতা দেব সেনের ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে 'হে পূর্ণ তব চরণের কাছে' গ্রন্থটি রচনা রচনারীতি, বৈশিষ্ট্য নিজের ভাষায় আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স)।

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,নবনীতা দেবসেনের 'হে পূর্ণ তব চরণের কাছে' একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট ভ্রমণ গ্রন্থ, যা তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধ, গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং নিজস্ব রচনারীতির জন্য বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে।আর সেই স্বতন্ত্রতায় আমরা দেখি-

       ভিন্ন দৃষ্টিতে তীর্থযাত্রাঃ'হে পূর্ণ তব চরণের কাছে'ভ্রমণ গ্ৰন্থে মূলত নবনীতা দেবসেনের চারধাম যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, বদ্রীনাথ, কেদারনাথ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। তবে এটি কোন প্রচলিত ধারার তীর্থযাত্রার বর্ণনামাত্র নয়। এখানে তিনি তীর্থযাত্রার প্রথাগত ধার্মিক আচারের বাইরে গিয়ে যাত্রার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ এবং তার সঙ্গে মিশে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে তুলে ধরেছেন। সেই জীবনযাত্রায় আছে-

       সরস ও রসবোধের বিবরঃ আমরা জানি নবনীতা দেবসেনের লেখার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অসামান্য রসবোধ। কঠিন পথ, প্রতিকূল পরিস্থিতি বা অপ্রত্যাশিত ঘটনার বর্ণনাতেও তিনি হাস্যরসের সঞ্চার করতে পারতেন। যেখানে পাঠক তাঁর সহজ, সাবলীল এবং সরস ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে ভ্রমণপথের সঙ্গী হয়ে ওঠেন।আর বলা যায় যে,এই রসবোধই গ্রন্থটিকে নিছক তথ্যমূলক ভ্রমণকাহিনী থেকে আলাদা করে এক উপভোগ্য সাহিত্যকর্মে পরিণত করেছে। সেই সাহিত্য কর্মের আছে-

       ব্যক্তি অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণঃলেখিকা আলোচ্য গ্ৰন্থে কেবল বাইরের দৃশ্য বর্ণনা করেননি, বরং বলা যায় যে,তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি, চিন্তা ও পর্যবেক্ষণকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।আর সেই যাত্রাপথে মানুষের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন, বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে মেলামেশা এবং সেসব থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তুলে ধরেছেন। যারফলে গ্রন্থটি আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সেই সরস জীবনে দেখা যায়-

       মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতাঃনবনীতা দেবসেনের লেখায় মানুষের প্রতি এক গভীর সংবেদনশীলতা দেখা যায়। তিনি পথেঘাটে দেখা হওয়া সাধারণ মানুষ, গাইড, দোকানদার বা অন্যান্য তীর্থযাত্রীদের জীবনযাত্রা, তাদের সংগ্রাম এবং সরলতাকে পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। চন্দন সিংহ, মাধোদাসজীর মতো চরিত্রগুলি তাঁর লেখার মাধ্যমে পাঠকের মনে এক বিশেষ স্থান করে নেয়।

        ভাষার স্বাচ্ছন্দতাঃ লেখিকা নবনীতা দেবসেনের ভাষা অত্যন্ত সহজবোধ্য, সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আসলে তিনি তিনি গুরুগম্ভীর শব্দ বা জটিল বাক্যবিন্যাস পরিহার করে এমনভাবে লিখেছেন যা আপামর সাধারণ পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয়।মনে হয় এটি যেন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি গল্প করার মতো।

       প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণঃ আলোচ্য গ্ৰন্থে হিমালয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তার বিশালতা এবং তার সঙ্গে মিশে থাকা আধ্যাত্মিক আবহ নবনীতা দেবসেনের বর্ণনায় এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। তিনি প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন এবং সেই প্রশান্তির উপলব্ধিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, ঠিক যেমনটি তিনি দেখেছেন।

       ভ্রমণের প্রেক্ষাপট ও মেয়েরাঃ নবনীতা দেবসেনের এই ভ্রমণ ছিল তাঁর মেয়ে পিকলো এবং ভাই রঞ্জনের সাথে। তৎকালীন সমাজে মেয়েদের একা বা দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করা এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিরল ছিল। এই প্রেক্ষাপাপটে তাঁর এই ভ্রমণ এবং তার নির্ভীক বর্ণনা নারী পাঠকের কাছে এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তিনি তথাকথিত "মেয়েমানুষের"জন্য "ভালো নয়" এই সকল গণ্ডিগুলো ভেঙে দিয়েছেন।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,নবনীতা দেবসেনের 'হে পূর্ণ তব চরণের কাছে' গ্ৰন্থটি একটি সাধারণ ভ্রমণকাহিনী নয়। এটি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অদম্য কৌতূহল, রসবোধ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য মিশ্রণ। আর এই সকলএই গুণাবলিই গ্রন্থটিকে বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছে একথা আমাদের স্বীকার করতেই হয়।ন

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...