Skip to main content

মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশল গুলি আলোচনা করো।

মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশল গুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।

          আমরা জানি যে, শিক্ষায় মূল্যায়ণের কৌশলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, দুর্বলতা এবং শিখনের কার্যকারিতা সঠিকভাবে নির্ণয় করা। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রচলিত মূল্যায়ন কৌশল নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।আর সেখানে আমরা দেখি- 

শিক্ষা বিজ্ঞানে মূল্যায়ণকে সাধারণত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়- ১) গঠনমূলক মূল্যায়ন ।                           ‌।                          ২)সমষ্টিগত মূল্যায়ন। আর এই দুই ধরনের মূল্যায়নের জন্য যে সকল কৌশল গুলি ব্যবহার করা হয় সেগুলি হলো-গঠনমূলক মূল্যায়ন এবং সমষ্টিনির্ভর মূল্যায়ন।এই দুই ধরনের মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়।আর সেখানে-

১)গঠনমূলক মূল্যায়ন (Formative Evaluation):এটি শিক্ষার প্রক্রিয়া চলাকালীন করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা, তাদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং তাদের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।

       •শ্রেণীকক্ষে পর্যবেক্ষণঃ শিক্ষক সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আচরণ, অংশগ্রহণ, এবং শিখনের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিখছে, তাদের মনোযোগ কেমন এবং কোন বিষয়ে তাদের অসুবিধা হচ্ছে।

    •প্রশ্নোত্তর পর্বঃক্লাসের মধ্যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করে তাদের ধারণার স্পষ্টতা পরীক্ষা করতে পারেন। এটি মৌখিক হতে পারে, যেখানে ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দেয়, অথবা লিখিত হতে পারে।যেমন: কুইজ।

    •কুইজ ও ছোট পরীক্ষাঃ কোনো একটি পাঠ বা অধ্যায় শেষ হওয়ার পর দ্রুত কুইজ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষক বুঝতে পারেন শিক্ষার্থীরা মূল বিষয়বস্তু কতটা বুঝতে পেরেছে।

 বাড়ির কাজ ও অ্যাসাইনমেন্টঃ শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ বা অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে যা শিখেছে, তা প্রয়োগ করার সুযোগ পায়। শিক্ষকের দেওয়া ফিডব্যাক তাদের ভুল সংশোধন করতে সাহায্য করে।

সেলফ অ্যাসেসমেন্টঃ শিক্ষার্থীরা নিজেদের কাজ নিজেরাই মূল্যায়ন করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করতে এবং শিখনের দায়িত্ব নিতে শেখে।যেখানে-

      পিয়ার অ্যাসেসমেন্টঃ শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাজ মূল্যায়ন করে। এতে তারা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে এবং গঠনমূলক মতামত দিতে শেখে। এটি তাদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা তৈরিতে সাহায্য করে।

  পোর্টফোলিওঃএটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীর কাজের একটি সংগ্রহ। এতে তার বিভিন্ন ধরনের কাজ (যেমন: প্রবন্ধ, প্রকল্প, চিত্র, নোট ইত্যাদি) জমা থাকে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, সৃজনশীলতা এবং প্রচেষ্টা বোঝা যায়।

২. সমষ্টিনির্ভর মূল্যায়ন (Summative Evaluation):এটি একটি শিক্ষাক্রম, কোর্স, বা শিক্ষাবর্ষের শেষে করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর সামগ্রিক পারদর্শিতা বিচার করা এবং তাকে একটি গ্রেড বা সার্টিফিকেট প্রদান করা।তবে সেখানে-

      •লিখিত পরীক্ষাঃএটি সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল। এর মধ্যে বহু-নির্বাচনী (MCQ), সংক্ষিপ্ত উত্তর, এবং রচনাধর্মী প্রশ্ন থাকতে পারে।

      •নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষাঃ এই ধরনের পরীক্ষায় সঠিক উত্তরের একটি নির্দিষ্ট রূপ থাকে, যেমন-MCQ, শূন্যস্থান পূরণ, সত্য/মিথ্যা নির্ণয় ইত্যাদি।

      •রচনাধর্মী পরীক্ষাঃ এই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীরতা প্রকাশ করতে পারে।

    •মৌখিক পরীক্ষাঃএই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মৌখিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীর জ্ঞান যাচাই করা হয়।

        পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়নঃএই কৌশলটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে কোনো কাজ করে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করে। যেমন-বিজ্ঞান প্রজেক্ট, উপস্থাপনা, নাট্য প্রদর্শন, বা ব্যবহারিক পরীক্ষা।

     •প্রজেক্ট ও গবেষণাঃ শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর গবেষণা করে একটি প্রজেক্ট বা রিপোর্ট তৈরি করতে দেওয়া হয়। এতে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার, তথ্য সংগ্রহ করার এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা যাচাই করা হয়।

      •ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্টঃ এটি শিক্ষার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বলতার কারণ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এটি সাধারণত শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে বা কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার সময় ব্যবহার করা হয়।

             • মূল্যায়ন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য •

একটি ভালো মূল্যায়ন কৌশলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত:

 •বৈধতা (Validity): মূল্যায়ন পদ্ধতিটি যা মাপতে চায়, তা সঠিকভাবে পরিমাপ করছে কি না।

 •নির্ভরযোগ্যতা (Reliability): একই পরিস্থিতিতে বারবার মূল্যায়ন করলে একই ফল পাওয়া যায় কি না।

 •স্বচ্ছতা (Transparency): মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট ও বোধগম্য হতে হবে।

 •ন্যায়পরায়ণতা (Fairness): মূল্যায়ন পদ্ধতিটি যেন সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান ও পক্ষপাতহীন হয়।

 •সাদৃশ্যতা (Authenticity): বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা।

        আসলে মূল্যায়নের সঠিক কৌশল নির্বাচন করা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উভয়ের জন্যই অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি কেবল ফলাফল জানার একটি উপায় নয়, বরং শিখনের প্রক্রিয়াকে উন্নত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...