Skip to main content

শাস্তি সম্পর্কিত(4th.Sem.) প্রতিরোধমূলক মতবাদ সবিচার আলোচনা করো।

'শাস্তি' সম্পর্কিত প্রতিরোধমূলক মতবাদ সবিচার আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার, দর্শন মাইনর)।

আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শাস্তি সম্পর্কিত প্রতিরোধমূলক মতবাদ হলো শাস্তির একটি ধারণা যেখানে শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধীকে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা। তবে এই মতবাদ অনুযায়ী, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যাতে সে শারীরিকভাবে অথবা মানসিকভাবে আর অপরাধ করতে না পারে। আসলে এটি একটি উপযোগবাদী এবং ভবিষ্যৎ-কেন্দ্রিক একটি ধারণা। আর সেই ধারণায়-

প্রতিরোধমূলক মতবাদের মূলনীতিঃএই মতবাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অপরাধীকে অক্ষম করে তোলা।এর মাধ্যমে অপরাধী যেন ভবিষ্যতে সমাজের জন্য আর হুমকি হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা হয়। তবে এই নিশ্চিতকরণ বিভিন্ন উপায়ে করা যেতে পারে। আর সেখানে-

অপরাধীকে শারীরিকভাবে অক্ষম করা: আমরা জানি যে, অতীতে একটা সময়ে হাত কেটে ফেলা বা অঙ্গহানির মতো কঠোর শাস্তির প্রচলন ছিল।যার উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীকে একই অপরাধ পুনরায় করা থেকে শারীরিকভাবে বিরত রাখা। যদিও আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় এই ধরনের শাস্তি অমানবিক বলে বিবেচিত হয়।আর সেই কারণে-

অপরাধীকে কারাগারে বন্দি রাখাঃঅপরাধীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে আটকে রাখলে সে সমাজের বাইরে থাকে এবং সেই সময়ে কোনো অপরাধ করতে পারে না। এটি একটি অপরাধীর অস্থায়ী অক্ষমতা।

মৃত্যুদন্ডঃ আমরা ভালো করেই জানি যে, মৃত্যুদন্ড অপরাধীকে স্থায়ীভাবে অক্ষম করে দেয়, কারণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর অপরাধী আর কোনো অপরাধ করতে পারে না। তবে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে (যেমন, বেপরোয়া গাড়ি চালানো), ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করে অপরাধীকে সেই বিশেষ অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা হয়।

             •প্রতিরোধমূলক মতবাদের সুবিধা•

১) সমাজের নিরাপত্তাঃ প্রতিরোধমূলক মতবাদ সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। সেই সাথে অপরাধীকে আটক বা অক্ষম করার মাধ্যমে সমাজে অপরাধের হার কমানো যায়। শুধু তাই নয়-

২) ভয় সৃষ্টিতেঃ শাস্তির ভয় দেখিয়ে সম্ভাব্য অপরাধীদের অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা যায়। এটি প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলে, যা সাধারণ মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। সেই সাথে-

৩) পুনরাবৃত্তি রোধঃ প্রতিরোধমূলক মতবাদে অপরাধী যাতে একই অপরাধ বারবার না করে বা না করতে পারে সেদিকে এই মতবাদ অধিক গুরুত্ব দিতে সক্ষম।

       •প্রতিরোধক মূলক মতবাদের অসুবিধা•

১) অমানবিকতাঃপ্রতিরোধমূলক মতবাদের চরম প্রয়োগ যেমন, অঙ্গহানি বা মৃত্যুদণ্ড অনেক সময় অমানবিক বলে সমালোচিত হয়। আবার অনেক সময় শাস্তির মাত্রা অপরাধের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হতে পারে। আর সেখানে-

২)সংশোধনের অভাবঃ প্রতিরোধমূলক মতবাদে অপরাধীর সংশোধন বা পুনর্বাসনের দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সেখানে এর মূল লক্ষ্য হলো, কেবল অপরাধীকে দমন করা, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ প্রবণতা কমাতে সহায়ক নাও হতে পারে। তাই -

৩) মৌলিক অধিকার সংক্রান্তঃ অনেক সময় এই মতবাদে দেখা যায় যে,ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়।কারণ এই মতবাদে বিশেষত যখন শাস্তি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সেকারণেই-

৪) ন্যায়ের ভারসাম্যহীনতাঃ যদি শাস্তির মূল লক্ষ্য কেবল প্রতিরোধ হয়, তবে অপরাধের প্রকৃত প্রকৃতি বা অপরাধীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করা নাও হতে পারে, যা সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে। আর সে কারণেই প্রয়োজন-

প্রতিকারমূলক মতবাদঃ এই মতবাদ অনুযায়ী, শাস্তি হলো অপরাধের প্রতিশোধ। 'চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাত।-এই নীতির উপর ভিত্তি করে অপরাধী যা করেছে, তার জন্য তাকে অনুরূপ ফল ভোগ করতে হবে। এখানে মূল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ এবং অতীত কৃতকর্মের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আর সে কারণেই অনুসরণ করা দরকার-

 সংশোধনমূলক মতবাদ: প্রতিরোধমূলক মতবাদের মূল লক্ষ্য হলো, অপরাধীর চরিত্র সংশোধন করা এবং তাকে সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে ফিরিয়ে আনা। এখানে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অপরাধীকে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং তার মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,শাস্তি সম্পর্কিত প্রতিরোধমূলক মতবাদ সমাজে অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়,এটি সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অন্যদের মধ্যে অপরাধের ভয় তৈরি করতে সহায়ক হয়। তবে-                                                      প্রতিরোধমূলক মতবাদের কিছু গুরুতর অসুবিধাও রয়েছে। কারণ এটি মানবিক মূল্যবোধ এবং অপরাধীর সংশোধনের দিকটি উপেক্ষা করে। তবুও এটি একটি সুষম বিচার ব্যবস্থার জন্য প্রতিরোধমূলক, প্রতিকারমূলক এবং সংশোধনমূলক—সব মতবাদেরই সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন, যেখানে শাস্তির উদ্দেশ্য হবে কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অপরাধীর সংশোধন এবং সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধন।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...