• A-বচনের সীমিত আবর্তনের সপক্ষে যুক্তি দাও।
A- সকল কবি হয় মানুষ। ( আবর্তনীয় )
I-কোন কোনো মানুষ হয় কবি। (I) আবর্তিত
সাবেকি যুক্তিবিজ্ঞানীদের মতে, A বচনের সীমিত আবর্তন সম্পূর্ণ বৈধ কারণ এটি আবর্তনের সবকটি নিয়ম মেনে চলে। যদিও আধুনিক যুক্তিবিজ্ঞানে (বুলীয় ব্যাখ্যায়) সামান্য বচন থেকে বিশেষ বচনে আসা 'অস্তিত্বমূলক দোষ' হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু সাবেকি যুক্তিবিদ্যায় উদ্দেশ্য পদের অস্তিত্ব আছে ধরে নিয়ে একে বৈধ বলেই গণ্য করা হয়।
ওপরের আলোচনা ও নিয়ম বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় যে, A বচনের সীমিত আবর্তন-আবর্তনের সব নিয়ম অনুসরণ করে হয়। তাই যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুসারে একটি বৈধ অমাধ্যম অনুমান।
•যুক্তিবিজ্ঞানে 'সত্যতা' (Truth) এবং 'বৈধতা' (Validity) দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা হলেও এদের মধ্যে এক গভীর ও জটিল সম্পর্ক বিদ্যমান। সাধারণত সত্যতা বিচার করা হয় বচনের ক্ষেত্রে, আর বৈধতা বিচার করা হয় যুক্তির ক্ষেত্রে।
•সত্যতা ও বৈধতার মৌলিক পার্থক্য•
•সত্যতা (Truth): এটি বচনের ধর্ম। একটি বচন বা বাক্যের বিবৃতির সাথে যদি বাস্তবের মিল থাকে, তবে তা সত্য; না থাকলে মিথ্যা। যেমন-"বরফ হয় সাদা" এটি একটি সত্য বচন।
•বৈধতা (Validity): এটি যুক্তির কাঠামোর ধর্ম। যদি একটি যুক্তির আশ্রয়বাক্য থেকে সিদ্ধান্তটি অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় এবং যুক্তির নিয়মগুলি সঠিক থাকে, তবে যুক্তিটি বৈধ। যুক্তির উপাদান সত্য না মিথ্যা, তার ওপর বৈধতা নির্ভর করে না।
•সত্যতা ও বৈধতার পারস্পরিক সম্পর্ক•
যুক্তির আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের সত্যতা/মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে বৈধতার সম্পর্ককে চারটি ভাগে দেখা যায়।আর সেই ভাগ গুলি হলো-
ক) আশ্রয়বাক্য সত্য এবং সিদ্ধান্ত সত্য:
যদি আশ্রয়বাক্য সত্য হয় এবং যুক্তিটি বৈধ হয়, তবে সিদ্ধান্ত অবশ্যই সত্য হবে। একে 'নির্ভরযোগ্য যুক্তি' (Sound Argument) বলা হয়।উদাহরণ-
সকল মানুষ হয় মরণশীল। (সত্য)
সক্রেটিস হন একজন মানুষ। (সত্য)
∴ সক্রেটিস হন মরণশীল। (সত্য) — যুক্তিটি বৈধ।
খ) আশ্রয়বাক্য মিথ্যা কিন্তু সিদ্ধান্ত সত্য:
আশ্রয়বাক্য মিথ্যা হওয়া সত্ত্বেও একটি যুক্তি বৈধ হতে পারে যদি তার আকার ঠিক থাকে।উদাহরণ-
সকল মানুষের ডানা আছে। (মিথ্যা)
সব পাখির ডানা আছে। (সত্য)
∴ কোনো কোনো ডানাযুক্ত প্রাণী হয় মানুষ। (সত্য) — যুক্তিটি বৈধ।
গ) আশ্রয়বাক্য মিথ্যা এবং সিদ্ধান্তও মিথ্যা:
আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্ত উভয়ই মিথ্যা হওয়া সত্ত্বেও যুক্তির কাঠামো ঠিক থাকলে সেটি বৈধ হতে পারে। উদাহরণ-
সকল বাঘ হয় পাখি। (মিথ্যা)
সকল কাক হয় বাঘ। (মিথ্যা)
∴ সকল কাক হয় পাখি। (মিথ্যা) — যুক্তিটি বৈধ।
ঘ) আশ্রয়বাক্য সত্য কিন্তু সিদ্ধান্ত মিথ্যা (ব্যতিক্রম):
এটিই একমাত্র ক্ষেত্র যেখানে যুক্তিটি অবৈধ হতে বাধ্য। যুক্তিবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বৈধ যুক্তির আশ্রয়বাক্য সত্য অথচ সিদ্ধান্ত মিথ্যা হতে পারে না।উদাহরণ:
সকল মানুষ হয় মরণশীল। (সত্য)
সকল রাজা হয় মরণশীল। (সত্য)
∴ সকল রাজা হয় মানুষ। (সত্য - যদিও এখানে সিদ্ধান্ত সত্য, কিন্তু নিয়ম লঙ্ঘিত হলে কাঠামো অবৈধ হতে পারে)।
•বস্তুগত সামর্থ্য ও যৌগিক সামর্থ্য-এর পার্থক্য•
সামর্থ্য বা ‘পারা’ (Can) কথাটি দর্শনে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। জন হস্পার্স তাঁর ‘An Introduction to Philosophical Analysis’ গ্রন্থে সামর্থ্যের এই বিভাজনটি দেখিয়েছেন।
•বস্তুগত সামর্থ্য বনাম যৌগিক সামর্থ্য•
১)বস্তুগত সামর্থ্য (Material Possibility)
• বস্তুগত সামর্থ্য বলতে বোঝায়, কোনো কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান বা সরঞ্জামের উপস্থিতি। যখন কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্ত শর্ত বা উপকরণ বর্তমান থাকে, তখন তাকে বস্তুগত সামর্থ্য বলে।উদাহরণ-
আপনার কাছে যদি একটি ল্যাপটপ থাকে, বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে এবং ইন্টারনেট থাকে, তবে আপনার সিনেমা দেখার ‘বস্তুগত সামর্থ্য’ আছে।যার বৈশিষ্ট্য-বস্তুর অস্তিত্ব বা পরিবেশগত সুবিধার ওপর নির্ভর করে।
২)যৌগিক সামর্থ্য (Constitutional/Formal Possibility)।
• যৌগিক সামর্থ্য বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তির সহজাত দক্ষতা বা কৌশলগত জ্ঞান। কোনো কাজ কীভাবে করতে হয় তা জানা বা সেই কাজটি করার শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা থাকাকেই যৌগিক সামর্থ্য বলে। উদাহরণ-
একজন ব্যক্তি সাতার কাটতে জানেন। এখন তিনি মরুভূমিতে থাকলেও তাঁর সাঁতার কাটার ‘যৌগিক সামর্থ্য’ বিদ্যমান, যদিও সেখানে জল না থাকায় তাঁর বস্তুগত সামর্থ্য নেই।যার বৈশিষ্ট্য-এটি ব্যক্তির নিজস্ব গুণ, প্রশিক্ষণ বা দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।
•মূল পার্থক্যসমূহ• বস্তুগত সামর্থ্য ও যৌগিক সামর্থ্য।
১) বস্তুগত সামর্থ্য নির্ভরশীলতার দিক থেকে পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু -
•যৌগিক সামর্থ্য ব্যক্তির প্রশিক্ষণ, বুদ্ধি বা শারীরিক গঠনের ওপর নির্ভর করে। |
২) বস্তুগত সামর্থ্য উপস্থিতি র ক্ষেত্রে উপকরণ না থাকলে এই সামর্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু-
• যৌগিক সামর্যোথ্য সুযোগ বা উপকরণ না থাকলেও এই দক্ষতা ব্যক্তির মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। |
৩) উদাহরণের দিক থেকে গাড়ি চালানোর জন্য পেট্রোল ও গাড়ি থাকা হলো বস্তুগত সামর্থ্য। কিন্তু-
গাড়ি চালানোর নিয়ম জানা এবং হাত-পা সচল থাকা হলো যৌগিক সামর্থ্য।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,কোনো কাজ বাস্তবে ঘটার জন্য এই উভয় প্রকার সামর্থ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। যৌগিক সামর্থ্য থাকলেও বস্তুগত উপকরণের অভাবে কাজটির প্রকাশ ঘটে না, আবার উপকরণ (বস্তুগত সামর্থ্য) থাকলেও দক্ষতা (যৌগিক সামর্থ্য) ছাড়া কাজ করা সম্ভব নয়।
গুণ ও পরিমাণ অনুসারে নিরপেক্ষ বচনের চতুর্গুণ পরিকল্পনা বা শ্রেণিবিভাগ নিচে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো।
যুক্তিবিজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের মতে, বচনের গুণ (Quality) এবং পরিমাণ (Quantity)—এই দুটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ বচনকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়।
•গুণ ও পরিমাণ অনুসারে বচনের শ্রেণিবিভাগ•
১)সামান্য সদর্থক বচন- 'A' বচন।
যখন কোনো বচনে সমগ্র উদ্দেশ্য পদ সম্পর্কে কোনো কিছু স্বীকার করা হয়, তাকে সামান্য সদর্থক বচন বলে।
•আকার: সকল S হয় P।• দৃষ্টান্ত: সকল মানুষ হয় মরণশীল।
২)সামান্য নঞর্থক বচন- 'E' বচন
যখন কোনো বচনে সমগ্র উদ্দেশ্য পদ সম্পর্কে কোনো কিছু অস্বীকার করা হয়, তাকে সামান্য নঞর্থক বচন বলে।
•আকার: কোনো S নয় P।• দৃষ্টান্ত: কোনো মানুষ নয় পূর্ণ।
৩) বিশেষ সদর্থক বচন- 'I' বচন
যখন কোনো বচনের উদ্দেশ্য পদের অনির্দিষ্ট অংশ সম্পর্কে কোনো কিছু স্বীকার করা হয়, তাকে বিশেষ সদর্থক বচন বলে।
•আকার: কোনো কোনো S হয় P। •দৃষ্টান্ত: কোনো কোনো ছাত্র হয় মেধাবী।
৪) বিশেষ নঞর্থক বচন- 'O' বচন
যখন কোনো বচনের উদ্দেশ্য পদের অনির্দিষ্ট অংশ সম্পর্কে কোনো কিছু অস্বীকার করা হয়, তাকে বিশেষ নঞর্থক বচন বলে।
• আকার: কোনো কোনো S নয় P।• দৃষ্টান্ত: কোনো কোনো ফুল নয় লাল।
•বচনের নাম•সাংকেতিক নাম•গুণ•পরিমাণ•দৃষ্টান্ত।
•সামান্য সদর্থক বচন-A •সদর্থক •সামান্য •সকল কবি হয় কল্পনাপ্রবণ।
•সামান্য নঞর্থক বচন- E •নঞর্থক •সামান্য •কোনো মানুষ নয় অমর।
•বিশেষ সদর্থক বচন- I• সদর্থক• বিশেষ •কোনো কোনো আম হয় মিষ্টি।
•বিশেষ নঞর্থক বচন-O বচন•নঞর্থক•বিশেষ•কোনো কোনো পশু নয় হিংস্র।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে ,নিরপেক্ষ বচনের এই শ্রেণিবিভাগকে যুক্তিবিজ্ঞানে 'বচনের চতুর্বর্গ পরিকল্পনা' বলা হয়। এখানে 'সামান্য' মানে সমগ্র শ্রেণীকে বোঝায় এবং 'বিশেষ' মানে শ্রেণীর অন্তত একজনকে বা কিছু অংশকে বোঝায়।
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন (মাইনর) সিলেবাস অনুযায়ী, নিরপেক্ষ বচনের পদের ব্যাপ্যতা সংক্রান্ত ৫ নম্বরের উত্তরটি নিচে সহজভাবে উপস্থাপন করা হলো।
পদের ব্যাপ্যতা (Distribution of Terms)
•যুক্তিবিজ্ঞানে কোনো পদ যখন তার দ্বারা নির্দেশিত শ্রেণীর সকল সদস্যকে বোঝায়, তখন সেই পদটিকে ব্যাপ্য বলা হয়। আর যখন পদটি শ্রেণীর কেবল একটি অংশকে বোঝায়, তখন তাকে অব্যাপ্য বলা হয়। গুণ ও পরিমাণ অনুসারে চারটি নিরপেক্ষ বচনের ব্যাপ্যতা নিচে আলোচনা করা হলো:
•বচন অনুযায়ী পদের ব্যাপ্যতা•
১) সামান্য সদর্থক বচন (A) •ব্যাপ্য পদ: উদ্দেশ্য পদ। (এখানে সমগ্র উদ্দেশ্য শ্রেণীকে স্বীকার করা হয়) এবং অব্যাপ্য পদ: বিধেয় পদ।উদাহরণ-
‘সকল মানুষ হয় মরণশীল’-এখানে সকল 'মানুষ' সম্পর্কে বলা হয়েছে বলে উদ্দেশ্য পদটি ব্যাপ্য, কিন্তু সকল 'মরণশীল' জীব মানুষ নয় বলে বিধেয়টি অব্যাপ্য।
২. সামান্য নঞর্থক বচন (E)•ব্যাপ্য পদ: উদ্দেশ্য ও বিধেয়-উভয় পদ।উদাহরণ-
‘কোনো মানুষ নয় অমর’-এখানে মানুষ শ্রেণীর সকলকে এবং অমর শ্রেণীর সকলকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়েছে। তাই উভয় পদই ব্যাপ্য।
৩. বিশেষ সদর্থক বচন (I)•ব্যাপ্য পদ: কোনো পদই ব্যাপ্য নয়।অব্যাপ্য পদ: উদ্দেশ্য ও বিধেয়-উভয় পদ।উদাহরণ-
‘কোনো কোনো ফুল হয় লাল’-এখানে সব ফুল বা সব লাল বস্তু সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, তাই উভয় পদ অব্যাপ্য।
৪. বিশেষ নঞর্থক বচন (O)•ব্যাপ্য পদ: বিধেয় পদ।অব্যাপ্য পদ: উদ্দেশ্য পদ।উদাহরণ-
‘কোনো কোনো ছাত্র নয় মেধাবী’-এখানে ছাত্রদের একটি অংশ সম্পর্কে বলা হয়েছে বলে উদ্দেশ্য অব্যাপ্য, কিন্তু মেধাবী শ্রেণীর কাউকেই ওই নির্দিষ্ট ছাত্রদলের মধ্যে রাখা হয়নি বলে বিধেয় ব্যাপ্য।
•সংক্ষেপে মনে রাখার নিয়ম (ASEBIN Rule)•
•A বচনের S (Subject/উদ্দেশ্য) ব্যাপ্য।
•E বচনের B (Both/উভয়) ব্যাপ্য।
•I বচনের N (None/কেউ নয়) ব্যাপ্য।
•O বচনের P (Predicate/বিধেয়) ব্যাপ্য।
Comments
Post a Comment