অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আপনকথা' গ্রন্থটির শ্রেণি বিচার বা সাহিত্যিক প্রকরণ বা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আপনকথা’ (১৯৪৬) বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্যসাধারণ সৃষ্টি। এটি মূলত লেখকের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিকথা। তবে গ্রন্থটি কেবল ব্যক্তিগত ইতিহাসের দলিল নয়, বরং এর শিল্পগুণ, ভাষা এবং চিত্রধর্মিতা একে এক বিশেষ সাহিত্যের শ্রেণিতে উন্নীত করেছে। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে গ্রন্থটির শ্রেণি বিচার করা হলো-
•স্মৃতিকথা বা আত্মজৈবনিক রচনা হিসেবে আপনকথা।‘আপনকথা’র প্রধান শ্রেণিগত পরিচয় হলো এটি একটি স্মৃতিকথা (Memoirs)। লেখক এখানে তাঁর জীবনের প্রথম দিককার স্মৃতিগুলিকে রোমন্থন করেছেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, বাবা গুণেন্দ্রনাথ, দাদা ফটিক (গগনেন্দ্রনাথ), এবং দক্ষিণ বারান্দার জীবন—সবই এখানে স্মৃতির পটে ধরা পড়েছে। এটি বিশুদ্ধ আত্মজীবনী নয়, কারণ এতে ঘটনাক্রমের চেয়ে স্মৃতির আবেগ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।আর সেখানে আছে-
•শিল্পীর আত্মপ্রকাশ ও শিল্প-জিজ্ঞাসা।এই গ্রন্থটিকে 'শিল্পীর আত্মজীবনী' বলা যায়। অবনীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন শিল্পী তৈরি হন। শৈশবের পঙ্খের কাজ দেখা, জ্যান্ত খুড়িমার গল্প শোনা, কিংবা নর্ম্যান সাহেবের কাছে ছবি আঁকা শেখা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পী-মানস বা ‘এস্থেটিক সেন্স’ তৈরি হওয়ার ইতিহাস এখানে বর্ণিত। তাই এটি কেবল জীবনকথা নয়, বরং শিল্প-সৃষ্টির রহস্যকথা।আর সেই রহস্যকথার সাথে আছে-
•চিত্রধর্মী সাহিত্য বা ‘ছবি-লেখা’।অবনীন্দ্রনাথ মূলত একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন। তাঁর লেখনীতেও সেই তুলির টান স্পষ্ট। 'আপনকথা'র প্রতিটি পরিচ্ছেদ যেন এক একটি শব্দচিত্র। তাঁর বর্ণনায় জোড়াসাঁকোর গলি, দক্ষিণের বারান্দা বা বর্ষার দুপুর পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এজন্য সমালোচকরা একে ‘ছবি-লেখা’ বা চিত্রধর্মী গদ্যের সার্থক উদাহরণ বলে মনে করেন। শুধু তাই নয়-
•সমকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির দলিল আপনারা গ্ৰন্থটি।গ্রন্থটি একটি ঐতিহাসিক দলিল বা সামাজিক আলেখ্য হিসেবেও গণ্য। উনিশ শতকের শেষার্ধে ঠাকুরবাড়ির জীবনযাত্রা, তখনকার আভিজাত্য, পোশাক-আশাক, উৎসব এবং সর্বোপরি সমকালীন কলকাতার একটি খণ্ডচিত্র এখানে পাওয়া যায়। ঠাকুরবাড়ির অন্দরের রীতিনীতি এবং সেখানকার শিল্পানুরাগী পরিবেশের বাস্তব চিত্র এটি।আর সেই চিত্রে ফুটে উঠেছে-
•রূপকথার মেজাজে বাস্তব আখ্যান। আর সেখানে শ্রেণি বিচারে 'আপনকথা'র গদ্যশৈলী অনেকটা রূপকথা বা উপকথার মতো। লেখক বাস্তব ঘটনাকে স্মৃতির আবহে এমনভাবে পরিবেশন করেছেন যে তা অনেক সময় অলীক বা মায়াবী মনে হয়। তাঁর ভাষা সহজ, ঘরোয়া এবং কথ্য ঢঙের, যা স্মৃতিকথাকে এক অদ্ভুত মাধুর্য দান করেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে ,‘আপনকথা’কে নির্দিষ্ট কোনো একটি সংকীর্ণ শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। এটি একাধারে স্মৃতিকথা, শিল্প-দর্শন এবং ঐতিহাসিক আখ্যানের এক অপূর্ব সমন্বয়। অবনীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন এটি তাঁর স্মৃতির পটে আঁকা ছবি। সুতরাং, এটি এমন এক শ্রেণির সাহিত্য যেখানে ইতিহাস ও কল্পনা, বাস্তব ও ছবি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যে আত্মজৈবনিক রচনার ক্ষেত্রে ‘আপনকথা’ তার নিজস্ব শৈলী ও আঙ্গিকের কারণে এক স্বতন্ত্র উচ্চাসনে আসীন।
Comments
Post a Comment