Skip to main content

একা' প্রবন্ধটি অবলম্বনে কমলাকান্তের নিঃসঙ্গতার স্বরূপ আলোচনা করো

'একা' প্রবন্ধটি অবলম্বনে কমলাকান্তের নিঃসঙ্গতার স্বরূপ আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।

     আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থের 'একা' প্রবন্ধটি এক গভীর জীবনদর্শন ও তীব্র নিঃসঙ্গতার দলিল। আর এই প্রবন্ধে কমলাকান্তের এই "একা" হওয়ার বোধ কেবল আক্ষরিক নির্জনতা নয়, বরং এটি একটি দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা।আর সেই অবস্থায় আমরি দেখি-

    •ব্যক্তিক নিঃসঙ্গতা ও আফিমখোর কমলাকান্ত। আসলে কমলাকান্ত একজন আফিমখোর হিসেবে আমাদের কাছে অতি পরিচিত। সমাজের মূলধারার মানুষের কাছে তিনি ব্রাত্য বা অপ্রকৃতিস্থ। তার চারপাশের মানুষ যখন বস্তুগত সুখে মত্ত, কমলাকান্ত তখন তার কাল্পনিক জগতের বাসিন্দা। এই নেশা তাকে বাহ্যিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অনন্য মানসিক নির্জনতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার অন্যতম কারণ-

      • সংসারের অনিত্যতা ও শূন্যতায় ভরা।কমলাকান্তের দৃষ্টিতে এই বিশাল জগত এক 'রঙ্গালয়'। এখানে সবাই আসছে, নিজের ভূমিকা পালন করছে এবং চলে যাচ্ছে। তিনি দেখেছেন- যাদের তিনি আপন ভেবেছিলেন, তারা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়,সংসারের মায়ার বাঁধন যে কতটা ঠুনকো, তা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন।তাই এই রূঢ় সত্যটিই তাকে দিয়ে বলিয়েছে-

             "এই সংসারে আমি একা।"

 সর্বজনীন নিঃসঙ্গতায় আমরা দেখি,কমলাকান্তের একা থাকা কেবল তার ব্যক্তিগত বিষাদ নয়। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, মানুষ মূলত জন্ম থেকেই একা। ভিড়ের মাঝে থেকেও মানুষের অন্তরের হাহাকার কেউ শুনতে পায় না। তার মতে, জগতের আনন্দ-উৎসবের মাঝেও ব্যক্তির আত্মা শেষ পর্যন্ত নিঃসঙ্গ। তিনি লিখেছেন যে-

 "আমি একা-কেবল আমি একা নই, জগতই একা।"

       • ভালোবাসার অভাব ও হাহাকারে বিদীর্ণ কমলাকান্ত। আলোচ্য প্রবন্ধটিতে কমলাকান্তের হৃদয়ের এক গভীর অতৃপ্তি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি এমন কাউকে খুঁজেছেন যাকে তিনি মন উজাড় করে ভালোবাসতে পারেন বা যিনি তাকে বুঝবেন। কিন্তু এই স্বার্থপর পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অভাব তাকে আরও বেশি একাকী করে তুলেছে।

        •দার্শনিক নির্লিপ্ততায় শেষ পর্যন্ত কমলাকান্তের এই নিঃসঙ্গতা তাকে এক ধরণের বৈরাগ্যের দিকে নিয়ে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, বাহ্যিক কোলাহল দিয়ে মনের শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। এই একাকীত্বই তাকে জীবনের গভীরতর সত্যগুলো বুঝতে সাহায্য করেছে।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,কমলাকান্তের 'একা' থাকা কোনো অহংকার নয়, বরং এটি এক বিষাদময় সত্যের উপলব্ধি। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রিয়জন হারানোর শোক এবং মানুষের চিরন্তন একাকীত্ব-সব মিলিয়েই কমলাকান্তের "এই সংসারে আমি একা" উক্তিটি এক চরম হাহাকার হয়ে ফুটে উঠেছে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...