'নবান্ন' নাটকের প্রধান সমাদ্দার চরিত্রটির পরিচয়
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' (১৯৪৪) নাটকটি পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে রচিত। এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রধান সমাদ্দার কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং সে তৎকালীন বাংলার শোষিত ও সর্বস্বান্ত কৃষক সমাজের এক জীবন্ত প্রতীক। আমিনিয়া গ্রামের এই বৃদ্ধ চাষির চরিত্রের বিবর্তন ও বৈশিষ্ট্যগুলো হলো -
প্রধান সমাদ্দারের ভূমির প্রতি নাড়ির টান এ নাটকে অতি প্রকট।আর সেখানে প্রধান সমাদ্দার বাংলার সেই চিরন্তন কৃষক, যার কাছে জমিই হলো মা। পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং যুদ্ধের কালো ছায়া যখন তার সব কেড়ে নেয়, তখনও সে তার ভিটেমাটি আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তার কাছে কৃষিকাজ কেবল পেশা নয়, বরং একটি ধর্ম। সে বলে-
"জমি আমার মা, আর ধান হল ঘরের লক্ষ্মী।"
প্রধান সমাদ্দার চরিত্রটিতে মন্বন্তর ও চরম অসহায়তা লক্ষ্যণীয়। র্দুভিক্ষের লেলিহান শিখা যখন প্রধানের সাজানো সংসার তছনছ করে দেয়, তখন তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসহায়তা সমান্তরালে ফুটে ওঠে। খাবারের অভাবে নিজের নাতনি ও পরিজনদের ধুঁকতে দেখে তার হাহাকার পাঠককে ব্যথিত করে। ধান চুরি হওয়ার পর তার আক্ষেপ-
"সব গেল, সব গেল! গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভরা গোরু ছিল-আজ সব ফাঁকি।"
আত্মমর্যাদাবোধ ও প্রতিবাদী চেতনা সমৃদ্ধ চরিত্র প্রধান সমাদ্দার।আসলে প্রধান সমাদ্দার মেরুদণ্ডহীন কোনো চরিত্র নয়। গ্রামের শোষক ও জোতদারদের বিরুদ্ধে তার ঘৃণা স্পষ্ট। যখন দয়ার নামে তাকে ভিক্ষে দিতে চাওয়া হয়, তখন তার আত্মমর্যাদা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সে ক্ষুধার্ত হতে পারে, কিন্তু সে ভিখারি নয়। তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে অবদমিত ক্রোধ—
"আমরা তো চাষাভুষো মানুষ, আমরা তো ভিক্ষে করতে জানি না।"
নগরজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও মোহমুক্তি ঘটে প্রধান সমাদ্দার চরিত্রটিতে। আসলে বাঁচার তাগিদে প্রধান যখন গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় আসে, তখন সে দেখে শহরের মানুষের চরম অমানবিকতা। ডাস্টবিনের খাবার নিয়ে কুকুরের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তার মোহমুক্তি ঘটে। শহরের তথাকথিত সভ্য সমাজের মুখোশ তার কাছে খুলে যায়। কলকাতার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারে, তার আসল শক্তি তার গ্রাম আর তার মাটি।
পুনর্জাগরণ ও আশাবাদ ব্যক্ত হয় এই চরিত্রটিতে।নাটকের শেষাংশে প্রধান সমাদ্দারের চরিত্রে এক আমূল পরিবর্তন দেখা যায়। সমস্ত হারিয়েও সে ভেঙে পড়ে না। সে আবার গ্রামে ফিরে আসে এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। 'নবান্ন' উৎসবের মধ্য দিয়ে সে যৌথ কৃষিখামারের বা সমবেত লড়াইয়ের বার্তা দেয়। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় আশার বাণী—
"মড়কে মরব না, দুর্ভিক্ষে মরব না—আমরা নতুন করে নবান্ন করব।"
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,প্রধান সমাদ্দার চরিত্রটি বিজন ভট্টাচার্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি। সে একইসঙ্গে ট্র্যাজিক এবং লড়াকু। একদিকে সে ভাগ্যের শিকার, অন্যদিকে সে এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্নদ্রষ্টা। নাট্যকার এই চরিত্রের মাধ্যমেই প্রমাণ করেছেন যে, বাংলার কৃষককে চরম বিপর্যয়েও পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
Comments
Post a Comment