Skip to main content

কালীপ্রসন্ন সিংহ, সংবাদ প্রভাকর, বঙ্গদর্শন টীকা।

পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস ও পরীক্ষার মানদণ্ড অনুযায়ী (৫ নম্বরের উপযোগী) কালীপ্রসন্ন সিংহ, সংবাদ প্রভাকর, বঙ্গদর্শন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা। 

          •কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০ - ১৮৭০)•

       ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে কালীপ্রসন্ন সিংহ এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। মাত্র ৩০ বছরের স্বল্পস্থায়ী জীবনে তিনি তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও সমাজসেবার মাধ্যমে আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির ভিত মজবুত করেছিলেন।

      ১) 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' ও বাংলা গদ্যঃকালীপ্রসন্ন সিংহের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হলো 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' (১৮৬২)। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ব্যঙ্গধর্মী গদ্যগ্রন্থ। তৎকালীন কলকাতার বাবু কালচার, ভণ্ডামি ও সামাজিক অবক্ষয়কে তিনি এই গ্রন্থে 'হুতুমি' বা চলিত ভাষায় নিপুণভাবে তুলে ধরেন। তাঁর এই চলিত গদ্যরীতি বাংলা সাহিত্যের ভাষাশৈলীতে এক যুগান্তর এনেছিল।

      ২) মহাভারতের অনুবাদঃ কালীপ্রসন্ন সিংহের অক্ষয় কীর্তি হলো মূল সংস্কৃত থেকে 'মহাভারত'-এর ১৮টি পর্ব বাংলায় অনুবাদ করা। বহু পণ্ডিতের সহায়তায় বিশাল ব্যয়ে তিনি এই কাজ সম্পন্ন করেন এবং তা বিনামূল্যে বিতরণ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যের দরজা খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

      ৩)নাট্যচর্চা ও বেলগাছিয়া থিয়েটারঃ বাংলা নাটকের উন্নতির জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি নিজে 'বিক্রমোর্ভশীয়', 'সাবিত্রী-সত্যবান' ও 'মালতী-মাধব' নাটক রচনা ও অনুবাদ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'বিদ্যোৎসাহিনী সভা' ও 'বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চ' আধুনিক বাংলা থিয়েটারের বিকাশে সহায়ক হয়েছিল।

      ৪)সমাজসেবা ও দেশপ্রেম: কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও মানবতাবাদী। নীলচাষিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি সক্রিয় ছিলেন। এমনকি জেমস লং সাহেবের কারাদণ্ড হলে তিনি তাঁর জরিমানার এক হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে মুক্ত করেন। সমাজ সংস্কার ও সংস্কৃতির প্রসারের জন্য তিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি অকাতরে ব্যয় করেছিলেন।

         সাহিত্যের আঙ্গিক পরিবর্তন, চলিত ভাষার প্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণে কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন একজন অগ্রপথিক। তাই 'হুতোম প্যাঁচা' ছদ্মনামের অন্তরালে থাকা এই মানুষটি আজও বাংলা সাহিত্যে প্রাতঃস্মরণীয়।

••সংবাদ প্রভাকরঃঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের ইতিহাসে 'সংবাদ প্রভাকর' একটি মাইলফলক।

       প্রতিষ্ঠাঃ ১৮৩১ সালের ২৮শে জানুয়ারি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথমে এটি সাপ্তাহিক হিসেবে শুরু হলেও ১৮৩৯ সালে এটি বাংলার প্রথম দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

     সাহিত্যের গুরুত্বঃ এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্রের মতো বিখ্যাত লেখকরা এখানে লিখতেন। মধ্যযুগীয় ধারার অবসান ঘটিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যোগসূত্র তৈরি করেছিল এই পত্রিকা।

      সামাজিক ভূমিকাঃসমাজ সংস্কার, বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার মতো বিষয়ে এই পত্রিকা জনমত গঠনে সাহায্য করত। এটি ছিল খাঁটি দেশীয় মেজাজের পত্রিকা।

      ঐতিহাসিক গুরুত্বঃ পুরনো কবিদের জীবনী ও কবিতা সংগ্রহ করে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এই পত্রিকার মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

                       

          ••বঙ্গদর্শনঃ বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার ভূমিকা অপরিসীম।

       প্রতিষ্ঠাঃ ১৮৭২ সালের ১৫ই এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এই মাসিক পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু হয়।

      সাহিত্যিক অবদানঃ বঙ্কিমচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলো (যেমন— 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্ণকান্তের উইল', 'রাজসিংহ') এই পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো। শুধুমাত্র সাহিত্য নয়, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও সমাজতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে এটি বাঙালির চিন্তাশক্তিকে শাণিত করেছিল।

       জাতীয়তাবাদঃ বাঙালির মনে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলতে এই পত্রিকা অনন্য ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের কালজয়ী গান 'বন্দে মাতরম্' প্রথম এই পত্রিকাতেই (আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে) প্রকাশিত হয়।

      পরবর্তী পর্যায়ঃ বঙ্কিমচন্দ্রের পর মাঝখানে এটি বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় এটি আবার নবপর্যায়ে প্রকাশিত হতে শুরু করে।

         'বঙ্গদর্শন' ছিল আধুনিক বাংলা মননশীল গদ্যের শ্রেষ্ঠ বাহন। এটি বাংলাকে কেবল একটি ভাষা নয়, একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছিল।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...