স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শ ও শিক্ষার লক্ষ্য আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাস)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন মহান দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষাগুরু। তাঁর মতে, শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহ করা নয়, বরং চরিত্রের বিকাশ। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন-
"Education is the manifestation of the perfection already in man"
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে আগে থেকেই যে পূর্ণতা বিদ্যমান, তার বহিঃপ্রকাশই হলো শিক্ষা।
•বিবেকানন্দের মতে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্যসমূহ•
১) চরিত্র গঠনঃবিবেকানন্দের মতে, শিক্ষার প্রধান ও প্রথম লক্ষ্য হলো চরিত্র গঠন। তিনি মনে করতেন, এমন শিক্ষা প্রয়োজন যা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায় এবং কঠোর পরিশ্রমী ও নীতিবান করে তোলে। তাঁর কথায়- "যে শিক্ষা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে না, তাকে শিক্ষা বলা যায় না।"
২) মানুষ গড়ার শিক্ষাঃবিবেকানন্দ তথাকথিত পুঁথিগত শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন 'মানুষ গড়ার শিক্ষা'। যেখানে শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক শক্তির সুসমন্বয় ঘটবে এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা তৈরি হবে।
৩)আত্মবিশ্বাসের বিকাশঃবিবেকানন্দ মনে করতেন, নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস না থাকলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীর মনে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলা যে- "আমি সব পারি।" তিনি বলতেন, আত্মবিশ্বাসহীন হাজার উপাসনার চেয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস অনেক বেশি শক্তিশালী।
৪)শারীরিক বিকাশঃ শিক্ষার একটি প্রধান দিক হলো সুস্থ শরীর। বিবেকানন্দ যুবসমাজকে বলতেন, "গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলার মাধ্যমে তোমরা স্বর্গের অধিকতর নিকটবর্তী হতে পারবে।" তাঁর মতে- "সবল মন কেবল সবল শরীরেই বাস করতে পারে।"
৫. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐক্য:
শিক্ষা হবে সার্বজনীন। বিবেকানন্দ মনে করতেন সকল ধর্মের মূল সত্য এক। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে এই আধ্যাত্মিক চেতনা জাগিয়ে তোলা উচিত যাতে সে সকল মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতে শেখে।
৬. নারী শিক্ষা ও জনশিক্ষা:
স্বামীজি মনে করতেন সমাজকে উন্নত করতে হলে নারী শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের (গরিব মানুষের) শিক্ষা অপরিহার্য। তিনি বলতেন, "এক ডানা দিয়ে যেমন পাখি উড়তে পারে না, তেমনি নারীকে পিছিয়ে রেখে সমাজ এগোতে পারে না।"
৭. সেবার আদর্শ:
বিবেকানন্দের শিক্ষার আর এক অন্যতম লক্ষ্য হলো 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'। অর্থাৎ মানুষের সেবা করাই হলো ঈশ্বরের সেবা। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ত্যাগ ও সেবার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
শিক্ষাদান পদ্ধতি:
* বিবেকানন্দ একাগ্রতা (Concentration)-কে শিক্ষার মূল চাবিকাঠি মনে করতেন।
* শিক্ষকের ভূমিকা হবে একজন বন্ধুর বা পথপ্রদর্শকের মতো।
* ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার কথা তিনি বলেছেন।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শ কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং অত্যন্ত ব্যবহারিক। তাঁর দর্শন হলো— "শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার জাগরণ।" বর্তমান অস্থির সময়ে বিবেকানন্দের এই 'মানুষ গড়ার শিক্ষা' এবং 'চরিত্র গঠনকারী শিক্ষা' বিশ্বের দরবারে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
পরীক্ষার টিপস: * উত্তর লেখার সময় স্বামীজির গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতিগুলো (যেমন: "মানুষ গড়ার শিক্ষা") আলাদা রঙে বা বোল্ড করে লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যায়।
* পয়েন্টগুলো স্পষ্ট
ভাবে উপশিরোনাম দিয়ে লিখবে।
Comments
Post a Comment