Skip to main content

ভালোবাসিতে না পারিলে কেহই সুখী হয় না"— কমলাকান্তের এই উক্তির মধ্য দিয়ে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

ভালোবাসিতে না পারিলে কেহই সুখী হয় না"— কমলাকান্তের এই উক্তির মধ্য দিয়ে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন? আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার)।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থের 'একা' প্রবন্ধে কমলাকান্তের জবানিতে ফুটে উঠেছে এক চিরন্তন মানবিক সত্য।আর সেই সত্যটি হলো-"ভালোবাসিতে না পারিলে কেহই সুখী হয় না।" 

       আসলে এই উক্তিটি কেবল একটি আবেগপ্রবণ কথা নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব ও সার্থকতা নিয়ে এক গভীর জীবনদর্শনের পরিচয়বাহী।আর সেই পরিচয়ে আমরা পাই-

       •মনুষ্যত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে ভালোবাসা।আর সেখানে কমলাকান্তের মতে, মানুষের জীবন কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার নাম নয়। বুদ্ধি বা জ্ঞান মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে পারে, কিন্তু পূর্ণতা দেয় হৃদয়বৃত্তি। ভালোবাসা হলো সেই সেতুবন্ধন যা একজন মানুষকে অন্য মানুষের সাথে, এমনকি প্রকৃতির সাথে যুক্ত করে। এই সংযোগ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব মরুভূমির মতো শুষ্ক।যে মরুভূমিতে ফুটে উঠেছে-

        •আত্মকেন্দ্রিকতা বনাম সুখ।আসলে মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর হতে চায়, কিন্তু কমলাকান্ত দেখিয়েছেন যে আত্মকেন্দ্রিকতায় সাময়িক লাভ থাকলেও প্রকৃত সুখ নেই। আবার যে কেবল নিজেকে ভালোবাসে, তার জগত অতি ক্ষুদ্র।তবে যখন মানুষ অন্যকে ভালোবাসতে শেখে, তখন তার সত্তার বিস্তার ঘটে। অন্যের সুখে সুখী হওয়া এবং অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়ার মধ্যেই হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি নিহিত।যেখানে-

     • নিঃসঙ্গতা ও ভালোবাসার অভাব আছে।আসলে প্রবন্ধটিতে কমলাকান্ত নিজেকে অত্যন্ত একা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এই একাকীত্ব কেবল লোকসঙ্গের অভাব নয়, বরং এমন একজনের অভাব যাকে ভালোবাসা যায়। তিনি উপলব্ধি করেছেন-

  "পরের জন্য যাহার প্রাণ কাঁদে না, তাহার এই বিশাল সংসারে কোনো স্থান নাই।"

        অর্থাৎ ভালোবাসার পাত্র না থাকলে হৃদয়ের সব আবেগ ও করুণা নিজের ভেতরেই গুমরে মরে, যা মানুষকে সুখী হওয়ার পরিবর্তে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে।আর এরূপ অবস্থায় সুখী হওয়ার একমাত্র পথ

     •ত্যাগের আনন্দে সুখ।ভালোবাসা মানেই হলো নিজের চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে অন্যকে কিছু দেওয়া। বঙ্কিমচন্দ্র কমলাকান্তের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, গ্রহণ করার চেয়ে দেওয়ার আনন্দ অনেক বেশি গভীর। যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসতে পারে না, সে এই মহৎ আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। তার জীবন এক নিরন্তর রিক্ততায় কাটে। তবেই-

    • বিশ্বজনীন প্রীতি ও ঈশ্বরানুভূতিতে কমলাকান্তের এই দর্শনের শেষ প্রান্ত হলো বিশ্বজনীন প্রেম। তিনি মনে করেন, যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে ভালোবাসতে না-ও পারে, তবে তার উচিত সমগ্র মানবজাতি বা সৃষ্টিকে ভালোবাসা। এই 'প্রীতি' বা ভালোবাসাই মানুষকে ক্ষুদ্র 'আমি' থেকে মুক্ত করে এক বৃহত্তর আনন্দের দিকে নিয়ে যায়। বঙ্কিমের ভাষায়, এই ভালোবাসাই হলো ধর্মের সারকথা।

        পরিশেষে বলা যায় যে, কমলাকান্তের এই উক্তিটি সুখের এক মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞা। টাকা-পয়সা, খ্যাতি বা আফিমের নেশা কোনোটিই মানুষের মনের স্থায়ী খোরাক হতে পারে না। হৃদয়ের শুষ্কতা দূর করার একমাত্র ঔষধ হলো ভালোবাসা। ভালোবাসা দিতে পারার সামর্থ্যই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ; আর এই সামর্থ্য যার নেই, সে পৃথিবীর যাবতীয় ঐশ্বর্যের মাঝেও চরম অসুখী।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...