Skip to main content

কোনি উপন্যাস, মতি নন্দী।

কোনি উপন্যাসের শুরুর অংশ (১-৩২ পৃষ্ঠা বা প্রথম দিকের পরিচ্ছেদগুলো) থেকে কাহিনী ও মূল বিষয়বস্তু উদ্ধৃতিসহ আলোচনা পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ দশম শ্রেণী প্রথম সেমিস্টার।

         • আলোচ্য কোনি উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় গঙ্গার ঘাটে। আর সেখানে 'বারুণী' উৎসবের পুণ্যস্নানের দৃশ্য আমরা দেখতে পাই।যেখানে আমরা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্ষিতীশ সিংহের পরিচয় পাই। এই ক্ষিতীশ সিংহ একজন জাত কোচ।গঙ্গার ঘাটে আম কুড়োনোর হিড়িকে তিনি লক্ষ্য করেন একটি মেয়ে (কোনি) অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় এবং জেদের সাথে অন্যদের টেক্কা দিয়ে আম সংগ্রহ করছে।আর এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে-

          কোনির শারীরিক ক্ষমতা এবং হার না মানা মানসিকতা প্রথমবার ক্ষিতীশের চোখে পড়ে। তিনি কোনির মধ্যে লুকিয়ে থাকা আগামীর চ্যাম্পিয়নকে চিনতে পারেন।তাই ক্ষিতীশ বলেন-

 "তোর আসল লজ্জা জ্বলে, আসল গর্বও জ্বলে।" 

       আসলে এই উক্তিটির মধ্যে দিয়ে আমরা বলতে পারি-ক্ষিতীশ সিংহের এই দর্শনটি উপন্যাসের মূল ভিত্তি।তবে -

        ক্ষিতীশ সিংহ 'জুপিটার ক্লাবে'র ট্রেনার ছিলেন।কিন্তু ক্লাবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নিয়মকানুনের কড়াকড়ির কারণে তাঁর সাথে অন্যদের বিরোধ বাধে।আসলে, ক্লাবের কর্তারা যখন নিয়ম এবং শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে সস্তার রাজনীতি শুরু করেন, তখন ক্ষিতীশ মাথা নত করতে অস্বীকার করেন।আর এই ঘটনার পর দীর্ঘ ৩০ বছরের যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি জুপিটার ক্লাব ত্যাগ করেন। আসলে এখানে ক্ষিতীশের আপসহীন ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাই।যিনি সাধারণের মধ্যে অসাধারণকে খুঁজে পেতে চান।তবে এখানে ক্লাব কর্তাদের বলতে শুনি-

         "যাকে আমরা ত্যাগ করছি সে কিন্তু বিষ।"

     ক্লাব কর্তাদের এই মন্তব্য ক্ষিতীশের বিদ্রোহী সত্তা জাগরিত হয়।

        •কোণির পারিবারিক ও আর্থিক সংকট•

       ক্ষিতীশ যখন কোণিকে সাঁতার শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি কোণিদের বস্তির জীবনের চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। কোণির বড় দাদা কমল একটি কারখানায় কাজ করে সংসার চালাত। সে নিজে সাঁতারু হতে চেয়েও অভাবের তাড়নায় পারেনি। কমলের মৃত্যু কোণির জীবনে এক বড় ধাক্কা হয়ে আসে।আর সেখানে-

          চরম দারিদ্র্য যে মেধার বিকাশে বাধা হতে পারে না, কোণির সংগ্রাম তা প্রমাণ করে। ক্ষিতীশ কোণিকে শুধু প্রশিক্ষণই দেননি, তার পুষ্টির জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সাহায্য করেছেন।

      •প্রশিক্ষণের শুরু: "খাটাল থেকে চ্যাম্পিয়ন"•

ক্ষিতীশ কোণিকে গঙ্গার ঘাট থেকে তুলে এনে সাঁতারের কঠোর শৃঙ্খলায় বাঁধতে শুরু করেন। শুরু হয় তাঁর জীবনের 'মিশন'। ক্ষিতীশ কোণিকে অ্যাপোলো ক্লাবে ভর্তি করান। সেখানে কোণিকে প্রতিদিন ভোরবেলা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ক্ষিতীশ তাঁর খাবারে ডিম, কলা ও দুধের ব্যবস্থা করেন, যা কোণির মতো দরিদ্র মেয়ের কাছে ছিল বিলাসিতা।তবে-

          এখানে গুরুর ধৈর্য এবং শিষ্যের অধ্যাবসায়ের এক অনন্য রসায়ন তৈরি হয়। ক্ষিতীশ জানতেন, কোণির মতো "কাঁচা হিরে"কে ঘষে ঘষে উজ্জ্বল করতে হবে।তাই ক্ষিতীশকে বলতে শুনি-

  "ফাইট কোণি ফাইট!" — এই মন্ত্রটি কোণিকে জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে লড়তে শিখিয়েছিল

           •হিয়া মিত্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা•

প্রথম সেমিস্টার সিলেবাসের মধ্যে কোণির প্রতিদ্বন্দ্বী হিয়া মিত্রের প্রাথমিক পরিচয় এবং তাদের মধ্যেকার সূক্ষ্ম রেষারেষি শুরু হয়।হিয়া মিত্র অভিজাত পরিবারের মেয়ে এবং সুশিক্ষিত সাঁতারু। অন্যদিকে কোণি সম্পূর্ণ অবহেলিত এক পরিবেশ থেকে উঠে আসা। তাদের এই সামাজিক ও ব্যক্তিগত লড়াই সাঁতারের ট্র্যাকে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

 •ক্ষিতীশ একজন আদর্শবাদী কোচ, যিনি মেধার মর্যাদা দিতে জানেন।কোণির লড়াই-দারিদ্র্য এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক কিশোরীর হার না মানা জেদ।দারিদ্র্য চিত্র।কলকাতার বস্তি জীবনের অভাব ও যন্ত্রণার বাস্তব ছবি।ক্ষিতীশ ও কোণির সম্পর্কের মাধ্যমে গুরু-শিষ্যের প্রাচীন ঐতিহ্য আধুনিক প্রেক্ষাপটে ফুটে উঠেছে।•


১) "বারুণী" কী? 

       • বারুণী হলো চৈত্র মাসে গঙ্গাস্নানের একটি উৎসব। এই দিনেই ক্ষিতীশ প্রথমবার গঙ্গার ঘাটে কোনিকে আম কুড়োতে দেখেছিলেন।

২) ক্ষিতীশ সিংহ কোণিকে প্রথম কোথায় এবং কী অবস্থায় দেখেছিলেন?

       • ক্ষিতীশ সিংহ কোনিকে প্রথম দেখেছিলেন গঙ্গার ঘাটে। কোনি তখন অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে অন্যের মুখ থেকে আম কেড়ে নিয়ে জলের মধ্য দিয়ে সাঁতরে আম সংগ্রহ করছিল।

৩.)"জুপিটার" ক্লাব থেকে ক্ষিতীশকে কেন পদত্যাগ করতে হয়েছিল?

       • জুপিটার ক্লাবের কর্মকর্তাদের দলাদলি, ঈর্ষা এবং ক্ষিতীশের কঠোর শাসনকে 'ডিক্টেটরশিপ' বলে অপবাদ দেওয়ার কারণে আত্মসম্মান রক্ষার্থে ক্ষিতীশ পদত্যাগ করেন।

৪) ক্ষিতীশ সিংহের স্ত্রীর নাম কী? তাঁদের সংসার চলত কীভাবে? 

      •ক্ষিতীশের স্ত্রীর নাম লীলাবতী। তাঁদের সংসার চলত মূলত লীলাবতীর দর্জির দোকান 'সিনহা টেলারিং'-এর আয় থেকে।

৫)বিষ্ণু চরণ ধর কে ছিলেন? তিনি ক্ষিতীশের কাছে কেন এসেছিলেন? 

       •বিষ্ণু ধর ছিলেন একজন অত্যন্ত ধনী এবং স্থূলকায় ব্যক্তি।যিনি নিজের শরীরের চর্বি কমানোর জন্য এবং ডায়েট চার্ট তৈরির উদ্দেশ্যে ক্ষিতীশের সাহায্য নিতে এসেছিলেন।

৬)কোণির পারিবারিক অবস্থা কেমন ছিল?

      • কোণিরা অত্যন্ত দরিদ্র ছিল। কলকাতার এক ঘিঞ্জি বস্তিতে তারা থাকত। কোণির বাবা মারা গিয়েছিলেন এবং বড় দাদা কমল যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে।

৭)কমল কে? তার স্বপ্ন কী ছিল?

    •কমল ছিল কোণির বড় দাদা। সে নিজে একজন বড় সাঁতারু হতে চেয়েছিল, কিন্তু অভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর আগে সে ক্ষিতীশকে অনুরোধ করেছিল কোণিকে সাঁতারু তৈরি করার জন্য।

৮)"খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে আমি ওকে সাঁতারে নামাব"—বক্তা কে? তিনি কেন এ কথা বলেছেন?

      • বক্তা হলেন ক্ষিতীশ সিংহ। কোণির চরম দারিদ্র্যের কথা মাথায় রেখে তাকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার (ডিম, কলা, দুধ) দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রশিক্ষণে রাজি করানোর কৌশল নিয়েছিলেন তিনি।

৯. হিয়া মিত্রের পরিচয় দাও। 

     •হিয়া মিত্র ছিল অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারের মেয়ে এবং জুপিটার ক্লাবের একজন প্রতিভাবান সাঁতারু। প্রশিক্ষক প্রণবেন্দু বিশ্বাসের অধীনে সে প্রশিক্ষণ নিত এবং কোণির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।

১০. "ফাইট কোণি ফাইট"—এই উক্তিটির তাৎপর্য কী?

      •এটি ক্ষিতীশ সিংহের দেওয়া লড়াইয়ের মন্ত্র। এর মাধ্যমে তিনি কোণিকে দারিদ্র্য, বঞ্চনা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রেরণা দিতেন।




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...