সনেট হিসেবে 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার সার্থকতা বিচার করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা সাহিত্যে সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তক হলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ইতালীয় কবি পেত্রার্কের আদর্শে তিনি যে সনেট গুচ্ছ রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হলো 'কপোতাক্ষ নদ'। একটি আদর্শ সনেটের গঠনশৈলী ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে কপোতাক্ষ নদ কবিতাটিতে আমরা দেখি-
সনেটের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও পঙ্ক্তি বিন্যাস কপোতাক্ষ নদ কবিতাটিতে লক্ষ্যণীয়।আর সেখানে সনেটের প্রধান শর্ত হলো-সনেট চৌদ্দটি পঙ্ক্তির সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং প্রতিটি পঙ্ক্তিতে চৌদ্দটি অক্ষর থাকবে (অক্ষরবৃত্ত ছন্দে)। 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতাটিতে এই গাণিতিক সুষমা রক্ষিত হয়েছে।আর সেখানে পঙ্ক্তি বিন্যাসের দিক থেকে কবিতাটি দুটি অংশে বিভক্ত করা যেতে পারে। সেই দুটি অংশ হলো-
•অষ্টক- প্রথম আট পঙ্ক্তি।•ষষ্ঠক-পরবর্তী ছয় পঙ্ক্তি।
•সনেটের মূল ধর্ম হলো অষ্টকে 'ভাবের প্রবর্তনা' এবং ষষ্ঠকে 'ভাবের পরিণতি' বা পরিসমাপ্তি। 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় দেখা যায়-অষ্টক অংশে কবি ফ্রান্সে বসে সুদূর প্রবাসে নিজের জন্মভূমির কপোতাক্ষ নদকে স্মরণ করেছেন। তাঁর স্মৃতিকাতরতা ও আকুলতা এখানে প্রধান। সেই আকুলতায় প্রকাশ পায়-
"সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে! / সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;"
অপরদিকে ষষ্ঠক অংশে কবির এই ব্যক্তিগত আকুলতা এক গভীর সংশয় ও প্রার্থনায় রূপ নিয়েছে। তিনি নদের কাছে মিনতি করেছেন যেন নদ তাঁকে মনে রাখে। অর্থাৎ, স্মৃতির আবেগ থেকে এখানে একটি দার্শনিক পরিণতি লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয় সেই সঙ্গে লক্ষ্য করা যায়-
কপোতাক্ষ নদ কবিতাটিতে ছন্দ ও মিলবিন্যাস কাঠামো।পেত্রার্কীয় সনেটের মিলবিন্যাসকে মধুসূদন বাংলা ভাষার উপযোগী করে বিন্যস্ত করেছেন। 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার মিলবিন্যাসটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়-
•অষ্টকের মিলঃ ক খ ক খ / ক খ খ ক (ক-নে, খ-লে)।
° মনে (ক), বিরলে (খ), সনে (ক), কলে (খ), স্তনে (ক), ছলে (খ), কলে (খ), জনে (ক)।
•ষষ্ঠকের মিলঃ গ ঘ গ ঘ গ ঘ (গ-বে, ঘ-রে)।
° যাবে (গ), আর (ঘ), পাবে (গ), সংগীতে (ঘ), তবে (গ), মরে (ঘ)।
এই সুসংবদ্ধ মিলবিন্যাস কবিতাটিকে একটি ধ্রুপদী কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছে।
সনেট সাধারণত লঘু বিষয় নিয়ে রচিত হয় না। 'কপোতাক্ষ নদ'-এর মূল উপজীব্য হলো দেশপ্রেম ও স্মৃতিকাতরতা। বিদেশের মাটিতে বসে স্বদেশের এক তুচ্ছ নদের প্রতি কবির যে গভীর অনুরাগ প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে কোনো অলঙ্কার বাহুল্য নেই, বরং আছে এক সংহত আবেগ।আর সেই আবেগের মধ্যে আমরা দেখি-
"বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, / কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?"
আমরা জানি যে,সনেট মূলত গীতিধর্মী কবিতা। এখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়। 'কপোতাক্ষ নদ'-এ মধুসূদনের ব্যক্তিসত্তা অত্যন্ত প্রোজ্জ্বল। এখানে নদ কেবল একটি জলধারা নয়, বরং কবির শৈশবের স্মৃতি ও দেশমাতার প্রতিনিধি। যার মধ্যে আছে গীতিধর্মিতা ও ব্যক্তিনিষ্ঠতা
পরিশেষে বলতে পারি যে,গঠনগত সংহতি, পঙ্ক্তি সংখ্যার সীমাবদ্ধতা, নির্দিষ্ট মিলবিন্যাস এবং ভাবের সংকুচিত অথচ গভীর ব্যঞ্জনা—সনেটের এই সমস্ত গুণাবলি 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় বিদ্যমান। মধুসূদন পাশ্চাত্য সনেটের আঙ্গিক গ্রহণ করলেও তাতে বাংলা ভাষার মাধুর্য এবং নিজস্ব কবিত্বের যে স্বাক্ষর রেখেছেন, তাতে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক সনেট হিসেবে কালজয়ী হয়ে আছে।
Comments
Post a Comment