Skip to main content

মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগর চরিত্র নির্মাণে বিপ্রদাস পিপলাই-এর স্বাতন্ত্র্যতার পরিচয় দাও।

মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগর চরিত্র নির্মাণে বিপ্রদাস পিপলাই-এর স্বাতন্ত্র্যতার পরিচয় দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিপ্রদাস পিপলাই-এর ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে চাঁদ সদাগর চরিত্রটি এক অনন্য সৃষ্টি। কারণ বিজয়গুপ্ত বা মুকুন্দরামের চাঁদ সদাগরের তুলনায় বিপ্রদাসের চাঁদ চরিত্রটি স্বতন্ত্র পরিচয়বাহী।   মনসামঙ্গল কাব্যের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র চাঁদ সদাগর পৌরুষ, আত্মমর্যাদা এবং শিবভক্তির এক মূর্ত প্রতীক। আসলে বিপ্রদাস পিপলাই (১৪৯৫ খ্রি.) তাঁর কাব্যে চাঁদ চরিত্রটিকে চিরাচরিত ছাঁচে ফেললেও কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করে তুলেছেন। আর সেখানে আমরা দেখি- 

       •আপসহীন আভিজাত্য ও পৌরুষে পরিপূর্ণ চাঁদ সদাগর চরিত্রটি। আসলে বিপ্রদাসের চাঁদ কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি আভিজাত্যের প্রতীক। মনসা যখন একের পর এক আঘাত হেনে তাঁর সাত পুত্র ও সপ্তডিঙা বিনাশ করছেন, তখনও চাঁদ নত হননি। বিপ্রদাস দেখিয়েছেন, চাঁদের এই লড়াই কেবল জেদ নয়, বরং উচ্চতর মহাদেব-ভক্তির কাছে লৌকিক 'কানা' দেবীর কাছে নতিস্বীকার না করার এক আদর্শিক সংগ্রাম।

      •ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপট অতি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান মনসামঙ্গল কাব্যে।বিপ্রদাস তাঁর কাব্যে চাঁদের বাণিজ্য যাত্রার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং স্বতন্ত্র।আর সেখানে তিনি চাঁদের যাত্রাপথে সপ্তগ্রাম, কলকাতা, বেতড় প্রভৃতি সুনির্দিষ্ট জনপদের উল্লেখ করেছেন। যেখানে চাঁদের ডিঙা সাজানোর বর্ণনায় বিপ্রদাস সমকালীন বাংলার নৌ-নির্মাণ শিল্পের যে নিখুঁত তথ্য দিয়েছেন, তা অন্য কবিদের তুলনায় অনেক বেশি প্রামাণ্য।

      • মানবিক দুর্বলতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বময় চাঁদ সদাগর চরিত্রটি।বিপ্রদাসের চাঁদ চরিত্রটি অতিমানবিক কোনো সত্তা নয়। পুত্রশোক ও সর্বস্ব হারানোর পর চাঁদের মনের গভীরে যে হাহাকার, বিপ্রদাস তা অত্যন্ত দরদ দিয়ে এঁকেছেন। তবে এই শোকের মাঝেও তিনি যখন বলেন-

       "হাতে তালি দিয়া মোরে হাসিবে নগরী"

    তখন বোঝা যায় তিনি লোকলজ্জা ও নিজের সম্মানের ব্যাপারে কতটা সচেতন ছিলেন।

      • শিবভক্তি ও দার্শনিক দৃঢ়তাময় চাঁদ সদাগর চরিত্রটি।বিপ্রদাসের বর্ণনায় চাঁদ একজন একনিষ্ঠ শৈব। তাঁর কাছে 'হেঁতাল দণ্ড' কেবল লাঠি নয়, তা শিবদত্ত ক্ষমতার প্রতীক। মনসার অলৌকিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে চাঁদের এই লড়াই আসলে লৌকিক ধর্মের বিরুদ্ধে তান্ত্রিক বা উচ্চমার্গীয় ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা। বিপ্রদাস চাঁদকে দিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের মহিমা যেভাবে ঘোষণা করিয়েছেন, তা তাঁর কাব্যের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

      •নাটকীয়তায় ভরা চাঁদ সদাগর চরিত্রটি।কাব্যের শেষে চণ্ডীর অনুরোধে বা পরিস্থিতির চাপে চাঁদ যখন মনসাকে পূজা দিতে সম্মত হন, তখন বিপ্রদাস দেখিয়েছেন যে চাঁদ সরাসরি মনসার দিকে তাকাচ্ছেন না। তিনি বাম হাতে বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পূজা দিচ্ছেন। এই 'বাম হস্ত' দিয়ে পূজা দেওয়ার দৃশ্যটি চাঁদের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পরাজয়ের মধ্যেও নৈতিক জয়কে ব্যক্ত করে। আর এখানে আমরা সামগ্ৰিকভাবে বলতে পারি যে-

        চাঁদ সদাগর বণিক কুলে জন্মগ্রহণ করেও রাজকীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী।অদম্য জেদের কারণে সর্বস্ব হারিয়েও লৌকিক দেবী মনসাকে 'চেঙমুড়ী' বলে উপহাস করেন। তবুও বাস্তববাদ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাস্তববুদ্ধি ও ভৌগোলিক জ্ঞানের পরিচয় যেমন পাই ঠিক তেমনি পুত্রদের মৃত্যুতে গভীর শোকাতুর কিন্তু আদর্শে অটল।

      পরিশেষে বলতে পারি যে, বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর কাব্যে চাঁদ সদাগরকে কেবল একজন পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে গড়ে তোলেননি, বরং তাঁকে তৎকালীন বাংলার শক্তিশালী বণিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর অদম্য জেদ, ট্র্যাজিক বীরত্ব এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা বিপ্রদাসের চাঁদকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় 'এপিক' চরিত্রে উন্নীত করেছে।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...