"পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম": 'বিড়াল' প্রবন্ধের আলোকে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিড়াল' প্রবন্ধটি একটি শ্লেষাত্মক ও সমাজতাত্ত্বিক রচনার অনন্য নিদর্শন। "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম।"আর এখানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর'-এর অন্তর্গত 'বিড়াল' প্রবন্ধটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বিড়াল ও আফিমখোর কমলাকান্তের কথোপকথন মনে হলেও, এটি আসলে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক রূপক। বিড়ালটির মুখে বঙ্কিমচন্দ্র যে সাম্যবাদী দর্শনের অবতারণা করেছেন, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো- "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম"।আর এই উদ্ধৃতিটির প্রেক্ষাপট হলো-
প্রবন্ধে দেখা যায় যে, বিড়ালটি কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলায় কমলাকান্ত তাকে লাঠি নিয়ে মারতে উদ্যত হন। ঠিক সেই মুহূর্তে বিড়ালের মুখ দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র এক গভীর জীবনদর্শন ব্যক্ত করিয়েছেন। বিড়ালটি যুক্তি দেয় যে, বিত্তবানদের অতিরিক্ত খাবার যদি ক্ষুধার্তের পেট ভরায়, তবে তাতে পাপ নেই; বরং সেটিই প্রকৃত ধর্ম। এই তর্কের একপর্যায়ে কমলাকান্ত বিড়ালটিকে জ্ঞান দেওয়ার ছলে বলেন যে পরোপকারই পরম ধর্ম। বিড়ালটি অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে এই তত্ত্বটিকেই ঘুরিয়ে দিয়ে ধনী শ্রেণির ভণ্ডামিকে আক্রমণ করে। আবার এরই পাশাপাশি-
•সাম্যবাদের প্রতিফলন দেখতে পাই বিড়াল প্রবন্ধে।বিড়ালটির যুক্তিতে আধুনিক সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের সুর ধ্বনিত হয়। বিড়ালের মতে, ধনীরা যে অতিরিক্ত খাবার সঞ্চয় করে রাখে, তা মূলত দরিদ্রের প্রাপ্য। বিড়ালটি কমলাকান্তকে মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া যদি শ্রেষ্ঠ ধর্ম হয়, তবে বিড়াল যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় গৃহস্থের খাবার খায়, তখন সে মূলত গৃহস্থকে 'পরোপকার' করার সুযোগই করে দিচ্ছে।
•ধনীদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন কমলাকান্ত।সমাজে যারা নীতিবাক্য প্রচার করেন (যেমন কমলাকান্ত), তারা প্রায়ই ক্ষুধার্তের কষ্ট বোঝেন না। বিড়ালটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়— যদি ধনীদের উদ্বৃত্ত অংশ দরিদ্রদের বিলিয়ে দেওয়া হতো, তবে চুরির প্রয়োজন হতো না। "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম"-এই মহৎ বাক্যটি ধনীরা মুখে বললেও কাজে পরিণত করে না। বিড়ালটি প্রমাণ করে দেয় যে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় নীতি কথা শোনা কেবল উপহাস মাত্র।সেই উপহাসের সাথে পাই-
ধর্মের নতুন দিকের উন্মোচন।প্রথাগত ধর্ম বলতে আমরা পূজা-পার্বণ বা আচার অনুষ্ঠানকে বুঝি। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র বিড়ালের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, জীবের সেবা বা জীবের ক্ষুধা নিবারণই হলো প্রকৃত ধর্ম। বিড়ালটি কমলাকান্তকে উপহাস করে বলে যে, যদি কমলাকান্ত তাকে মারতে না এসে দুধটুকু খেতে দিত, তবেই তার "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম" পালন সার্থক হতো।
বঙ্কিমচন্দ্র এখানে 'ইউটিলিটারিয়ানিজম' বা উপযোগবাদের একটি প্রচ্ছন্ন ছোঁয়া রেখেছেন। সমাজ যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী হয়ে অন্যকে অবজ্ঞা করে, বিড়ালটি তার মূলে আঘাত করেছে। কমলাকান্তের মাধ্যমে লেখক বুঝিয়েছেন যে, শাস্ত্রের বচন আওড়ানো সহজ, কিন্তু ক্ষুধার্তের জ্বালা বুঝে নিজের ভোগ ত্যাগ করে পরোপকার করা অত্যন্ত কঠিন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম"-এই উক্তিটি বিড়াল প্রবন্ধে কেবল একটি নৈতিক বাক্য নয়, বরং এটি সমাজ সংস্কারের একটি হাতিয়ার। বঙ্কিমচন্দ্র বিড়ালের যুক্তির আড়ালে সমাজের উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির দ্বিচারিতাকে জনসমক্ষে এনেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন না হবে এবং ক্ষুধার্তের অন্ন সংস্থান না হবে, ততক্ষণ "পরোপকারী শ্রেষ্ঠ ধর্ম" কথাটি একটি অন্তঃসারশূন্য বুলিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
Comments
Post a Comment