কৃত্তিবাসী রামায়ণে বীররস ও ভক্তিরসের সমন্বয় ঘটেছে-আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস )।
আদিকবি বাল্মীকির সংস্কৃত রামায়ণ ছিল বীরগাথা ও রাজকীয় আভিজাত্যে পূর্ণ। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি কৃত্তিবাস ওঝা যখন সেই কাব্যকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলেন, তখন তা কেবল অনুবাদ রইল না, হয়ে উঠল বাঙালির নিজস্ব প্রাণের কাব্য। কৃত্তিবাসের অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব হলো মূল রামায়ণের বীররসকে অক্ষুণ্ণ রেখে তার সঙ্গে অত্যন্ত সুকৌশলে ও আবেগঘনভাবে ভক্তিরসের মিশ্রণ ঘটানো।আর সেখানে আমরা দেখি-
বীররসের উপস্থিতি ও প্রয়োগ বাল্মীকির রামায়ণে ছিল প্রধান উপজীব্য। কৃত্তিবাসের কাব্যেও যুদ্ধবিগ্রহ এবং বীরত্বের অভাব নেই। আবার বিচিত্র লঙ্কাকাণ্ডের যুদ্ধে রাম-রাবণের মহাপ্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ, ইন্দ্রজিতের মায়াযুদ্ধ এবং লঙ্কার রাক্ষসদের বিক্রম বর্ণনায় কৃত্তিবাস বীররস ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে রাবণের দম্ভ, ইন্দ্রজিতের শৌর্য এবং বীর হনুমানের লঙ্কা দহনের বর্ণনায় বীররসের চরম প্রকাশ ঘটেছে। কৃত্তিবাস যুদ্ধের বর্ণনায় লিখেছেন-
"গগন বিদরিয়া শব্দ ধায় দশ দিশে / দেব দানব গন্ধর্ব কাঁপে অতি তরাসে।"
•ভক্তিরসের অনুপ্রবেশ ও প্রাধান্য কৃত্তিবাসী রামায়ণে অন্যতম সম্পদ। যেখানে কৃত্তিবাসের সময়ের বাংলা ছিল বৈষ্ণবীয় ভাবধারার প্রাক্-কাল। তাই তিনি রামকে কেবল একজন ‘আদর্শ রাজা’ বা ‘বীর পুরুষ’ হিসেবে না দেখে, তাঁকে পরমাত্মা বা ভগবান শ্রীহরি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এই রামভক্তিই কাব্যের মূল বীররসকে ভক্তিরসে সিক্ত করেছে।আর সেখানে-
•রামের ঈশ্বরত্ব বিষয়টি পাঠক সমাজকে ভক্তি সাগরে ডুবিয়ে দেয়।আসলে কৃত্তিবাসের কাব্যে রামচন্দ্র মানুষের বেশধারী ভগবান। তাঁর শত্রু ও মিত্র উভয়ই তাঁর চরণে ভক্তি নিবেদন করে। যেখানে-
কৃত্তিবাসের মৌলিক উদ্ভাবন হলো রাবণ ও তার অনুচরদের মধ্যে ভক্তির সঞ্চার। মহাবীর বীরবাহু যখন রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসেন, তখন তাঁর মনে বীরত্বের চেয়ে ভক্তিই বড় হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন রামের হাতে মৃত্যু মানেই বৈকুণ্ঠ লাভ। অবশেষে কবি-
কৃত্তিবাস বীররস ও ভক্তিরসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দিলেন তাঁর রামায়ণ কাব্যে।আর নিদর্শন হিসেবে দেখতে পাই-বীররস ও ভক্তিরসের এই অপূর্ব মিশ্রণ কৃত্তিবাসী রামায়ণের কয়েকটি বিশেষ অংশে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
তরণীসেনের যুদ্ধে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সবচেয়ে স্মরণীয় ভক্তিপূর্ণ বীররস দেখা যায় তরণীসেনের চরিত্রে। তরণীসেন যুদ্ধ করতে এসেছেন রাবণের আদেশে, কিন্তু তাঁর রথে লেখা ‘রাম’ নাম। তিনি রামের সাথে যুদ্ধ করছেন কেবল তাঁর হাতে প্রাণ দিয়ে মোক্ষ লাভের আশায়। এখানে তলোয়ারের ঝনঝনানির চেয়ে ‘রাম নাম’ জপের সুর বেশি জোরালো। আবার-
বীরবাহু যুদ্ধে যখন রামের বাণে বিদ্ধ হন, তখন তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে রামের রূপ দর্শন করতে চান। কৃত্তিবাস এখানে বীরত্বকে ভক্তির অধীন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু রাবণের আক্ষেপের শেষ নেই!এমনকি লঙ্কাপতি রাবণও যখন অন্তিমকালে রামের মাহাত্ম্য স্বীকার করেন, তখন বীররস ভক্তিরসে পর্যবসিত হয়। আর সেখানে রাবণকে বলতে শুনি-
"জন্মে জন্মে তোমার চরণে দিও স্থান।"
বীররসের ওপর ভক্তিরসের জয়।কৃত্তিবাস কেন বীররসের চেয়ে ভক্তিকে প্রাধান্য দিলেন, তার সামাজিক কারণগুলি হলো-
বাঙালি জাতি জন্মগতভাবে কোমল ও ভাবপ্রবণ।রূঢ় বীরত্বের চেয়ে ভক্তি ও করুণ রসের আবেদন বাঙালির কাছে অনেক বেশি।এরই পাশাপাশি মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে কাব্যকে দেবমহিমা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো। কৃত্তিবাসও রামকে বাঙালির ‘ঘরের দেবতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, কৃত্তিবাসী রামায়ণে বীররস হলো অলঙ্কারের মতো, কিন্তু ভক্তিরস হলো তার প্রাণ। কৃত্তিবাস বাল্মীকির রুক্ষ ও গম্ভীর ধ্রুপদী বীরগাথাকে বাঙালির অশ্রু ও ভক্তির রসে ডুবিয়ে এক কোমল রূপ দিয়েছেন। তরণীসেন বা বীরবাহুর মতো চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রের রণহুঙ্কারও আসলে এক ধরণের আরাধনা হতে পারে। এই রস-সমন্বয়ের কারণেই কৃত্তিবাসী রামায়ণ আজও বাংলার ঘরে ঘরে পঠিত ও পূজিত হয়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment