প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ও সাহিত্যিক তাৎপর্য আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রমথ চৌধুরীর ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধটি একটি অনবদ্য সাহিত্য সমালোচনা। প্রমথ চৌধুরী (বীরবল) তাঁর তীক্ষ্ণ মননশীলতা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মধ্যযুগের শেষ বড় কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে যেভাবে পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। শুধু তাই নয়-বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী এক স্বতন্ত্র ঘরানার প্রবর্তক। তাঁর ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধটি কেবল একজন কবির জীবন বা কাব্যের নিছক আলোচনা নয়, বরং এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। যেখানে
ঊনবিংশ শতাব্দীর নীতিবাগীশ সমালোচকরা যখন ভারতচন্দ্রকে ‘অশ্লীল’ বা ‘কুরুচিপূর্ণ’ বলে দেগে দিচ্ছিলেন, তখন প্রমথ চৌধুরী তাঁর এই প্রবন্ধের মাধ্যমে ভারতচন্দ্রের প্রকৃত কবি-সত্তা ও শিল্প-নৈপুণ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে কলম ধরেন।আর সেখানে আমরা দেখি-
•আধুনিক রুচির আলোকে ভারতচন্দ্রের মূল্যায়ন করেন প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী।ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর মধ্যযুগের শেষ কবি হলেও তাঁর চেতনায় ছিল আধুনিকতার বীজ। প্রমথ চৌধুরীর এই প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতচন্দ্রকে কেবল ‘মঙ্গলকাব্যের’ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একজন ‘সচেতন শিল্পী’ হিসেবে তুলে ধরা। চৌধুরী মশাই মনে করতেন, ভারতচন্দ্রই প্রথম বাংলা সাহিত্যে ‘আর্ট’ বা শিল্পের মহিমা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রকাশের ভঙ্গি বা ‘Style’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
•অশ্লীলতার অভিযোগ খণ্ডনে প্রমথ চৌধুরী।ভারতচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তাঁর কাব্যের আদিরস বা কামুকতা। প্রমথ চৌধুরী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই অভিযোগ খণ্ডন করেছেন। তাঁর মতে, ভারতচন্দ্র যা লিখেছেন তা তাঁর সমকালীন রাজসভার রুচি ও সমাজের প্রতিফলন। প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন যে, সাহিত্যকে কেবল নীতিশাস্ত্র বা মরালিটির চশমা দিয়ে বিচার করা ভুল। ভারতচন্দ্রের কাব্যে যে দেহজ প্রেম আছে, তাকে তিনি শিল্পের খাতিরেই গ্রহণ করেছেন, কোনো বিশেষ কুরুচি ছড়ানোর জন্য নয়।
•নাগরিক চেতনার উদ্বোধনে প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী।প্রমথ চৌধুরী নিজে ছিলেন নাগরিক আভিজাত্য ও মার্জিত বুদ্ধিবৃত্তির প্রবক্তা। তিনি ভারতচন্দ্রের কাব্যে এক ধরণের ‘Urbanity’ বা নাগরিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন। গ্রাম্য পাঁচালির স্থূলতা ছেড়ে বাংলা কবিতা যে ভারতচন্দ্রের হাতে পড়ে মার্জিত, সুসংহত এবং বুদ্ধিদীপ্ত রূপ পেয়েছে—সেটি প্রমাণ করাই ছিল এই প্রবন্ধের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি ভারতচন্দ্রকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ‘আধুনিক’ কবি হিসেবে গণ্য করেছেন এই নাগরিক মননশীলতার কারণেই।
• ভাষার কারিগরি ও ছন্দকুশলতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছেন প্রমথ চৌধুরী।প্রমথ চৌধুরী ভারতচন্দ্রের ভাষাশৈলীর গুণমুগ্ধ ছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ভারতচন্দ্র শব্দের ওপর অসামান্য অধিকার রাখতেন। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের শব্দচয়ন, উপমার ব্যবহার এবং ছন্দের ঝঙ্কার যে কতটা নিখুঁত, তা প্রাবন্ধিক বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। ভারতচন্দ্রের ভাষা সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য-
"ভারতচন্দ্র ছিলেন রায়গুণাকর, অর্থাৎ গুণের খনি।"
•বৈষ্ণব ভাবালুতার বিপরীতে মননশীলতাতৎকালীন বাংলা সাহিত্যে যে অতিরিক্ত ভাবালুতা বা কান্নাকাটির (Sentimentalism) চল ছিল, প্রমথ চৌধুরী তার বিরোধী ছিলেন। তিনি ভারতচন্দ্রকে পছন্দ করতেন কারণ ভারতচন্দ্রের কাব্যে ভাবাবেগের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তির প্রাধান্য বেশি। চোখের জলের চেয়ে হাস্যকৌতুক ও শ্লেষের (Wit and Humor) যে গুরুত্ব সাহিত্যে থাকতে পারে, ভারতচন্দ্র প্রবন্ধের মাধ্যমে চৌধুরী মশাই সেই আদর্শই প্রচার করতে চেয়েছেন।
পরিশেষে বলতে পারি যে,প্রমথ চৌধুরীর ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধটি একটি ঐতিহাসিক সংশোধনবাদী কাজ। ভারতচন্দ্রকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি ভুল ধারণাকে ভেঙে ফেলাই ছিল প্রাবন্ধিকের চূড়ান্ত অভিপ্রায়। এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শিল্প কেবল হৃদয়ের বস্তু নয়, তা মস্তিস্কের বা মননশীলতারও ফসল। প্রমথ চৌধুরীর এই বীরবলী দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে ভারতচন্দ্রকে এক নতুন উচ্চতায় আসীন করেছে।
Comments
Post a Comment