Skip to main content

বাংলা সাময়িক পত্রের উদ্ভব ও বিকাশ: ‘দিকদর্শন’ থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ভূমিকা ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

বাংলা সাময়িক পত্রের উদ্ভব ও বিকাশ: ‘দিকদর্শন’ থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ভূমিকা ও গুরুত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস)

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে সাময়িক পত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্র কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং বাঙালির সমাজভাবনা, সাহিত্যচর্চা ও জাতীয়তাবোধ উন্মেষের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ১৮১৮ সালে ‘দিকদর্শন’ দিয়ে যে যাত্রার শুরু, ১৮৭২ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে।আর সেখানে-

     •১) দিকদর্শন (১৮১৮): সূচনাকালঃ বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে প্রথম পদচিহ্ন হলো শ্রীরামপুর মিশন থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দিকদর্শন’ (এপ্রিল, ১৮১৮)।

      গুরুত্বঃ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা। মূলত স্কুল বুক সোসাইটির ছাত্রদের জন্য ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ এতে প্রকাশিত হতো।

      ভূমিকা: প্রত্যক্ষ রাজনীতি বা সমাজ সংস্কারে লিপ্ত না থাকলেও, বাংলা গদ্যে তথ্যনিষ্ঠ ও জ্ঞানমূলক বিষয় উপস্থাপনের প্রথম কৃতিত্ব এই পত্রিকার।

       •২) সমাচার দর্পণ (১৮১৮): সংবাদধর্মিতার বিকাশঃ  ‘দিকদর্শন’-এর সাফল্যের পর ১৮১৮ সালের ২৩ মে মার্শম্যানের সম্পাদনাতেই প্রকাশিত হয় ‘সমাচার দর্পণ’।

        ভূমিকাঃএটি ছিল প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। এতে সরকারি ঘোষণা, দেশ-বিদেশের খবর এবং সামাজিক সমস্যার কথা ছাপা হতো।

       গুরুত্বঃ রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সপক্ষে ও বিপক্ষে জনমত গঠনে এই পত্রিকা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।

       •৩)সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১): পেশাদারিত্বের সূচনাঃ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ বাংলা সাংবাদিকতায় নতুন যুগের সূচনা করে।

      ভূমিকাঃএটি ১৮৩৯ সালে প্রথম বাংলা দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঈশ্বরগুপ্তের শাণিত ব্যঙ্গ ও দেশপ্রেমমূলক কবিতা এই পত্রিকাকে জনপ্রিয় করে তোলে।

      গুরুত্বঃ নতুন ও পুরাতন—উভয় ঘরানার সাহিত্যিকদের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল এই পত্রিকা। বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্রের মতো লেখকদের হাতেখড়ি এখানেই।

      •৪)তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা (১৮৪৩): মননশীলতার বিকাশঃ অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আনুকূল্যে প্রকাশিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ বাংলা সাময়িক পত্রের গুণগত মান পরিবর্তন করে দেয়।

        ভূমিকাঃ এই পত্রিকা বাঙালির ভাবলোক ও যুক্তিবাদী চিন্তার ধারক ছিল। সমাজ সংস্কার, বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের নিখুঁত বিচার এখানে প্রকাশিত হতো।

       গুরুত্বঃঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখের যুক্তিনিষ্ঠ গদ্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষা আভিজাত্য লাভ করে।

         ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.

          •৫)বিবিধার্থ সংগ্রহ (১৮৫১): জ্ঞানকোষের ধারণাঃ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকা ছিল প্রথম চিত্রিত সাময়িক পত্র। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও সাহিত্যের আলোচনায় এটি আধুনিক রুচির পরিচয় দেয়।

       •৬)বঙ্গদর্শন (১৮৭২)-শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত রূপঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) প্রকা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে এক মহাবিপ্লব। এই পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমেই বাংলা সাময়িক পত্র তার শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করে।

       সাহিত্যের নবদিগন্তঃ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ এবং কালজয়ী ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীত এই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়।

        জাতীয়তাবোধের উন্মেষঃ ‘বঙ্গদর্শন’ কেবল সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার মুখপত্র। ‘দেশের কথা’ বা ‘বাংলার কৃষক’ সংক্রান্ত প্রবন্ধের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র দেশাত্মবোধের বীজ বপন করেন।

       গদ্যের আধুনিকীকরণঃ তত্ত্ববোধিনীর গম্ভীর গদ্যকে সহজ, সরস ও আধুনিক রূপ দেন বঙ্কিমচন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বঙ্গদর্শন যেন বর্ষার প্রথম বৃষ্টির মতো বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয়েছিল।’

      গুরুত্ব ও মূল্যায়নঃবাংলা সাহিত্যে সুস্থ ও গঠনমূলক সমালোচনা সাহিত্যের মানদণ্ড তৈরি করেছিল এই পত্রিকা।‘দিকদর্শন’ থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পর্যন্ত যাত্রাপথটি ছিল বাংলা ভাষা ও বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার ইতিহাস। আসলে-

        এইসকল পত্রিকাগুলির মাধ্যমেই বাংলা গদ্য তার আড়ষ্টতা কাটিয়ে আধুনিক ও সাবলীল হয়ে ওঠে। সতীদাহ প্রথা রদ থেকে শুরু করে নীলকরদের অত্যাচার—সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার ছিল এই সাময়িক পত্রগুলো। তবে  সাময়িক পত্র না থাকলে বঙ্কিম-রবীন্দ্র যুগের মহৎ সাহিত্যসৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতো।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘দিকদর্শন’ যদি সাময়িক পত্রের বীজ বপন করে থাকে, তবে ‘বঙ্গদর্শন’ তাকে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত করেছে। ১৮১৮ থেকে ১৮৭২-এই দীর্ঘ সময়ে সাময়িক পত্রগুলোই বাঙালিকে আধুনিক মানুষে রূপান্তরিত করেছে এবং বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.

Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...