বিপ্রদাস পিপলাই-এর মনসামঙ্গল কাব্য অবলম্বনে সমাজ-ভাবনা ও সামাজিক অনুষঙ্গ আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৪৯৫ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ) বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর 'মনসামঙ্গল' কাব্য রচনা করেন। লৌকিক দেবী মনসার প্রতিষ্ঠার আড়ালে এই কাব্যে তৎকালীন জলপথ-কেন্দ্রিক বাণিজ্য, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এবং বাঙালি সমাজের সাধারণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত দলিল ফুটে উঠেছে।আর সেখানে আমরা দেখি-
•মনসামঙ্গল কাব্যে বণিক সমাজ ও সমুদ্র বাণিজ্যের প্রভাব।বিপ্রদাসের কাব্যে চাঁদ সদাগরের যে বাণিজ্য যাত্রার বর্ণনা রয়েছে, তা তৎকালীন বাংলার সমৃদ্ধ নৌ-বাণিজ্যের পরিচয় দেয়। আর সেই পরিচয়ে দেখি সপ্তগ্রামের মাহাত্ম্য। বিপ্রদাস উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর কাব্যে তৎকালীন বাণিজ্যনগরী সপ্তগ্রাম ও গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটের নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়াও চণ্ডী বা মনসার নির্দেশে সপ্তরত্ন বা ডিঙা তৈরির বিস্তারিত বিবরণ থেকে সমকালীন সূত্রধর ও কারিগর শ্রেণির দক্ষতা বোঝা যায়।
•হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন কবি বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর কাব্যে। আসলে বিপ্রদাস পিপলাই-এর কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো হিন্দু ও মুসলিম সমাজের সহাবস্থান ও সংঘাতের চিত্র।আর সেখানে কাব্যের 'কানা ওঝা' বা 'হাসান-হুসেন' পর্বে দেখা যায় মুসলিম কাজি ও মোল্লাদের সঙ্গে হিন্দু শিবভক্তদের বিবাদ। এটি আসলে সেই সময়ের নব-প্রবেশকারী মুসলিম সংস্কৃতির সাথে স্থানীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রাথমিক সংঘাতের প্রতিফলন।তবে- বিপ্রদাসের বর্ণনায় এক ধরণের লৌকিক সমন্বয়ও দেখা যায়, যেখানে বিপদে পড়লে নিম্নবর্গের মানুষ উভয় ধর্মের লৌকিক শক্তির দ্বারস্থ হতো।এরই পাশাপাশি-
•তৎকালীন বাঙালির ভোজনবিলাসের একটি স্পষ্ট তালিকা বিপ্রদাসের কাব্যে পাওয়া যায়। বেহুলার রন্ধন বা বিয়ের ভোজের বর্ণনায় দেখতে পাই যে-বিভিন্ন প্রকার মাছ (ইলিশ, চিতল, মাগুর), পিঠাপুলি এবং নিরামিষ ব্যঞ্জনের বর্ণনা রয়েছে। 'শুকুতা' (শুশনি শাক) বা তিতো খাবারের প্রচলন যে প্রাচীন বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের অংশ ছিল, তা তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট।
•নারীর অবস্থান ও অলঙ্কার প্রীতি বিদ্যমান এ কবির কাব্যগ্রন্থে।সমকালীন বাঙালি নারীর রূপ ও সাজসজ্জার বর্ণনায় বিপ্রদাস বেশ পটু ছিলেন। যেখানে বেহুলা কেবল সতীত্বের প্রতীক নয়, বরং তৎকালীন প্রতিকূল সমাজে নারীর ধৈর্য, বুদ্ধি ও সাহসের প্রতিনিধি। অলঙ্কার হিসেবে শাঁখা, সিঁদুর এবং সোনার বিভিন্ন গয়নার ব্যবহারের উল্লেখ তৎকালীন ধাতুশিল্প ও সামাজিক আচারের পরিচয় দেয়।
•জাতিভেদ ও পেশাভিত্তিক সমাজচিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর কাব্যে।বিপ্রদাসের কাব্যে সমাজ বিন্যাসের চিত্র ধরা পড়ে। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ থেকে শুরু করে ডোম, হাড়ি, বাগদি প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা এখানে উপস্থিত। বিশেষ করে ওঝা, ধন্বন্তরি এবং বৈদ্যদের প্রসঙ্গ তৎকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থা ও লোকবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়।
•ভৌগোলিক সামাজিকতায় আমরা দেখি-বিপ্রদাস তাঁর কাব্যে ভাগীরথী নদীর গতিপথ এবং তার দুই তীরের জনবসতির যে বিবরণ দিয়েছেন (যেমন: কুমারহট্ট, খড়দহ, কলকাতা, নাথুয়া), তা আধুনিক ইতিহাসের গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। তাঁর কাব্যে 'কলকাতা' (Colicotta) নামের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বিপ্রদাস পিপলাইয়ের 'মনসামঙ্গল' কেবল একটি ধর্মীয় কাব্য নয়; এটি মধ্যযুগের শেষভাগের অস্থির অথচ প্রাণবন্ত বাঙালি সমাজের এক প্রামাণ্য চিত্র। ধর্মীয় আবহে তিনি সমকালীন মানুষের অভাব-অভিযোগ, আনন্দ-উৎসব এবং ভৌগোলিক পরিবেশকে এমনভাবে গ্রথিত করেছেন যে তা ইতিহাসের উপাদানে পরিণত হয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment