ব্রিটিশ শাসনে ভারতবর্ষে প্রাশ্চ্যশিক্ষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ দশম শ্রেণি ইতিহাস প্রথম সেমিস্টার দশম শ্রেণি)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতে শিক্ষার মাধ্যম ও বিষয় নিয়ে যে বিবাদ দেখা দিয়েছিল, তা 'প্রাচ্যবাদী-পাশ্চাত্যবাদী দ্বন্দ্ব' নামে পরিচিত। ১৮১৩ সালের সনন্দ আইনে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রতি বছর ১ লক্ষ টাকা ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই টাকা কোন ধরণের শিক্ষার জন্য খরচ হবে, তা নিয়ে জনশিক্ষা কমিটির সদস্যদের মধ্যে দুটি দল তৈরি হয়, যা দীর্ঘ দুই দশকের দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।আর সেখানে-
১)প্রাচ্যবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করতেন, ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা এবং সাহিত্যের উন্নতিতে এই টাকা ব্যয় করা উচিত।যার সমর্থক ছিলেন এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমুখ।আর তাঁদের যুক্তি- তাঁরা মনে করতেন ভারতীয়দের নিজস্ব সংস্কৃতিতে শিক্ষিত করা হলে তারা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থাকবে।
২)পাশ্চাত্যবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা দাবি করেন যে, ১ লক্ষ টাকা আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান প্রসারের জন্য ব্যয় করা হোক।যার সমর্থক ছিলেন-আলেকজান্ডার ডাফ, মেকলে, সন্ডার্স কলভিন প্রমুখ। রাজা রামমোহন রায়ও এই মতের প্রধান সমর্থক ছিলেন।আর তাঁদের যুক্তি ছিল-তাঁদের মতে, ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আধুনিক ও যুক্তিবাদী করে তোলা সম্ভব।
৩) এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত মীমাংসা ঘটে ১৮৩৫ সালে। বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্কের আইন সচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে একটি বিখ্যাত প্রস্তাব বা 'মিনিট' পেশ করেন। তিনি প্রাচ্যের শিক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষার জয়গান করেন। মেকলের প্রভাবে বেন্টিঙ্ক ইংরেজি শিক্ষাকেই সরকারি নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। আর সেটি হলো-
৪)চুইয়ে পড়া নীতিঃ মেকলে মনে করতেন, সমাজের উচ্চবিত্তদের ইংরেজি শিক্ষিত করলে তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। একেই বলা হয় 'চুইয়ে পড়া নীতি'।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,এই দ্বন্দ্বের অবসানের ফলেই ভারতে ইংরেজি শিক্ষার পথ প্রশস্ত হয়, যার হাত ধরে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে।
Comments
Post a Comment