মনসামঙ্গল কাব্যে পৌরাণিক ও লৌকিক উপাদানের সমন্বয় কীভাবে ঘটেছে তার আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস ডিএস১০)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মনসামঙ্গল কাব্য হলো বাংলার লোকায়ত ধর্মের সঙ্গে আর্য বা পৌরাণিক সংস্কৃতির এক বিচিত্র সমন্বয় দেখতে পাই।আর সেখানে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্যগুলি আসলে উচ্চকোটির পৌরাণিক দেবকুলের সঙ্গে অন্ত্যজ শ্রেণির লৌকিক দেব-দেবীর সংঘাত ও পরিণতির আখ্যান। মনসামঙ্গল কাব্যে দেবী মনসা একদিকে যেমন পুরাণের মহিমা অর্জন করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর স্বভাব-আচরণে মিশে আছে বাংলার লৌকিক সমাজের মাটির গন্ধ।
পৌরাণিক উপাদান হিসেবে মনসাকে পৌরাণিক দেবীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য কবিরা বিভিন্ন সংস্কৃত পুরাণের (যেমন: পদ্মপুরাণ বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ) সাহায্য নিয়েছেন।আর সেখানে আমরা মনসার জন্মবৃত্তান্ত দেখি-কাব্যে মনসাকে শিবের মানসকন্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই 'মানস'জাত হওয়ার কারণেই তাঁর নাম মনসা, যা তাঁকে শিবের মতো এক শক্তিশালী পৌরাণিক দেবতার সঙ্গে যুক্ত করে। আবার এরই পাশাপাশি-
দেবী মনসার সর্পমাতা বা বিষহরী রূপটি পৌরাণিক 'জরৎকারু' মুনির পত্নী এবং আস্তিক মুনির মাতার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে চাঁদ সওদাগর বা বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর—প্রত্যেকেই স্বর্গের শাপভ্রষ্ট চরিত্র (যেমন: অনিরুদ্ধ-উষা)। এই কাঠামোটি সম্পূর্ণ পৌরাণিক আখ্যানের অনুসারী।
লৌকিক উপাদান হিসেবে আমরা পাই- মনসামঙ্গল কাব্যের মূল প্রাণশক্তি কিন্তু এর লৌকিক উপাদানের মধ্যেই নিহিত। দেবী এখানে কোনো শান্ত-সমাহিত স্বর্গীয় সত্তা নন, বরং রক্ত-মাংসের মানুষের মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ। যেখানে মানবিক ঈর্ষা ও কোন্দল লক্ষণীয়।মনসা ও চণ্ডীর মধ্যে যে সপত্নী-সুলভ বিবাদ এবং কোন্দল কাব্যে দেখা যায়, তা বাংলার মধ্যবিত্ত পল্লি-সমাজের ঘরোয়া কলহের চিত্র। মনসা এখানে কেবল দেবী নন, তিনি এক দুঃখিনী ও উপেক্ষিতা নারী।
পৌরাণিক দেবতারা সাধারণত স্তব-স্তুতিতে তুষ্ট হন। কিন্তু লৌকিক দেবী মনসা চাঁদ সওদাগরের মতো মর্ত্যের এক মানুষের হাতে পূজিত হওয়ার জন্য ছলনা, ভীতিপ্রদর্শন এবং বলপ্রয়োগ করেন—যা লৌকিক লড়াকু মানসিকতার পরিচয়।এরই পাশাপাশি সমভাবে দেখি-
বাংলার সমাজ ও গার্হস্থ্য জীবন। যেখানে বেহুলার সতীত্ব, তাঁর রান্নাবান্নার বিবরণ, অলঙ্কার পরা এবং চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যে যাওয়ার বর্ণনা—সবই তৎকালীন বাংলার লৌকিক সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র। মনসার প্রধান সহায়িকা 'নেতা ধোপানি' কোনো পৌরাণিক চরিত্র নন। তিনি বাংলার তান্ত্রিক ও লৌকিক যাদুবিদ্যার প্রতীক।আর সেখানে-
লৌকিক ও পৌরাণিকের দ্বন্দ্বে আবর্তিত চাঁদ সওদাগর। আসলে এই কাব্যের শ্রেষ্ঠ অংশ হলো শিব-উপাসক (পৌরাণিক) চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে 'কানা নেতী'র চেলা মনসার (লৌকিক) লড়াই। চাঁদ সওদাগর মনসাকে 'চ্যাংমুড়ী কাণী' বলে ব্যঙ্গ করছেন—এই সম্বোধনটির মধ্যেই লৌকিক অবজ্ঞা প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত চাঁদের বাম হাতে মনসা পূজা গ্রহণ করা আসলে উচ্চকোটির আভিজাত্যের কাছে লৌকিক শক্তির জয়কেই সূচিত করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,মনসামঙ্গল কাব্যের সাফল্য এখানেই যে, এটি পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যে লৌকিক সমাজ ও মানুষের আবেগকে জায়গা করে দিয়েছে। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে,
"মনসামঙ্গল কাব্যটি বাহির হইতে পৌরাণিক বলিয়া মনে হইলেও অন্তরে ইহা বাংলার একান্ত নিজস্ব ধন।"
আসলে লৌকিক দেবী যখন আভিজাত্যের সিঁড়ি বেয়ে পুরাণের জগতে প্রবেশ করেন, তখনই জন্ম নেয় মনসামঙ্গলের মতো সার্থক কাব্য।
Comments
Post a Comment