Skip to main content

মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলা চরিত্র নির্মাণে বিপ্রদাস পিপলাই-এর কবি-ভাবনার পরিচয় দাও।

মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলা চরিত্র নির্মাণে বিপ্রদাস পিপলাই-এর কবি-ভাবনার পরিচয় দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।

          আমরা জানি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী চরিত্র হলো বেহুলা। বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর 'মনসামঙ্গল' (১৪৯৫ খ্রি.) কাব্যে বেহুলা চরিত্রটিকে কেবল সতীত্বের প্রতীক হিসেবেই নয়, বরং অদম্য সাহস, বুদ্ধি এবং মানবিক দৃঢ়তার এক অনন্য বিগ্রহ হিসেবে নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয় এই বেহুলা চরিত্রটি নির্মাণে কবি ভাবনার মৌলিকতার পরিচয় পাই।আর সেখানে আমরা দেখি-

            বিপ্রদাসের বেহুলা প্রথাগত লাজুক বধূ নয়, বরং অত্যন্ত তেজস্বিনী। লখিন্দরের মৃত্যুর পর যখন সমাজ ও পরিজন তাঁকে 'মৃতের সাথে সহমরণ'-এর পরামর্শ দেয় অথবা বিধবা হিসেবে ঘরে থাকার কথা বলে, তখন বেহুলা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেলায় ভেসে যাওয়ার যে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন, তা কবির বলিষ্ঠ জীবন-ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ। শুধু তাই নয়-

        বিপ্রদাস বেহুলার চরিত্রে অসামান্য বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। লখিন্দরের লোহার বাসরে কালনাগিনী প্রবেশের ছিদ্রটি তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন। এছাড়া, কাব্যের এক অংশে বেহুলার রন্ধনশৈলীর যে বিস্তৃত বিবরণ কবি দিয়েছেন, তা সমকালীন বাঙালি নারীর গৃহকর্মে নিপুণতা এবং বিপ্রদাসের বাস্তববাদী কবি-দৃষ্টির পরিচয় দেয়।

            বেহুলার প্রেম কেবল আবেগনির্ভর নয়, তা ছিল কৃচ্ছ্রসাধন ও ত্যাগের প্রতীক।পচা-গলা মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেলায় ভেসে যাওয়ার সময় নানা প্রলোভন ও বাধা এলেও বেহুলা তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। বিপ্রদাস দেখিয়েছেন যে, বেহুলার এই প্রেম শেষ পর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং অলৌকিকতাকে পরাস্ত করে।

         নেতার পরামর্শে বেহুলা যখন স্বর্গের দেবসভায় নৃত্য পরিবেশন করেন, তখন তাঁর শিল্পীসত্তা ও সংগ্রামের এক চরম শিখর উন্মোচিত হয়। বিপ্রদাসের বর্ণনায়, বেহুলার এই নৃত্য কেবল চিত্তবিনোদনের জন্য ছিল না, তা ছিল স্বামীর প্রাণ ফিরে পাওয়ার এক আকুল প্রার্থনা। এখানে কবি দেখিয়েছেন যে, শিল্প ও নিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষ দেবতার আশীর্বাদও অর্জন করতে পারে।

        বিপ্রদাসের বেহুলা চরিত্রের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য হলো তাঁর আত্মমর্যাদা। মনসার আশীর্বাদে মৃত স্বামীদের ফিরে পাওয়ার পর তিনি যখন শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসেন, তখন তাঁর মধ্যে কোনো দম্ভ ছিল না। বরং এক নিপুণ কৌশলে তিনি শ্বশুর চাঁদ সদাগরকে দিয়ে মনসার পূজা করিয়ে পরিবারের বিবাদ মিটিয়েছেন। এখানে তিনি একজন সুযোগ্য পুত্রবধূ ও সমাজ-সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

         বিপ্রদাস পিপলাই তাঁর কাব্যে বেহুলাকে তৎকালীন ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন। গঙ্গার তীরবর্তী জনপদগুলি দিয়ে ভেলা নিয়ে যাওয়ার সময় বেহুলার যে অভিজ্ঞতা, তা আসলে কবির দেখা সমকালীন সমাজজীবনেরই খণ্ডচিত্র।

       পরিশেষে বলতে পারি যে, বিপ্রদাস পিপলাইয়ের বেহুলা চরিত্রটি মধ্যযুগীয় সাহিত্যের গতানুগতিক ছক ভেঙে এক আধুনিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। কবি তাঁকে কেবল অলৌকিক দয়ায় জীবন ফিরে পাওয়া নারী হিসেবে দেখাননি, বরং তাঁর কর্মশক্তি, ধৈর্য এবং বুদ্ধির জোরে জয়ী এক মানবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিপ্রদাসের লেখনীতে বেহুলা হয়ে উঠেছে বাংলার শাশ্বত নারীশক্তির এক অপরাজেয় প্রতীক।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...