বিড়াল' প্রবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্র হাস্যরসের অন্তরালে গভীর সমাজতত্ত্ব ও শ্লেষ প্রকাশ করেছেন তা আলোচনা করো।
'বিড়াল' প্রবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্র হাস্যরসের অন্তরালে গভীর সমাজতত্ত্ব ও শ্লেষ প্রকাশ করেছেন তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)
আমরা জানি যে,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিড়াল' প্রবন্ধটি রসাত্মক রচনার ছদ্মবেশে এক তীক্ষ্ণ সামাজিক দলিল। আপাতদৃষ্টিতে একটি বিড়াল ও আফিমখোর কমলাকান্তের কথোপকথন মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের বাংলার ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার প্রতি তীব্র শ্লেষ এবং মানবিক সাম্যবাদের জয়গান। আছে হাস্যরসের অন্তরালে গভীর সমাজতত্ত্ব ও শ্লেষ। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
বঙ্কিমচন্দ্র মূলত 'ইউটিলিটারিয়ান' বা উপযোগবাদ এবং সাম্যবাদী দর্শনের সংমিশ্রণে এই প্রবন্ধটি রচনা করেছেন। হাস্যরসের মোড়কে তিনি যে গভীর সত্যগুলো তুলে ধরেছেন বিড়াল প্রবন্ধে। আর সেখানে তুলে ধরেছেন রূপকের অন্তরালে শ্রেণিসংগ্রাম।প্রবন্ধের শুরুতেই বিড়াল যখন কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধটুকু খেয়ে ফেলে, তখন থেকেই সংঘাতের শুরু। এখানে 'বিড়াল' হলো বঞ্চিত, সর্বহারা শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতীক এবং 'কমলাকান্ত' তথা সমাজপতিরা হলো শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি। বিড়ালের চুরির সপক্ষে যুক্তিগুলো আসলে উচ্চবিত্তের সঞ্চিত সম্পদের ওপর দরিদ্রের অধিকারের দাবি।
•বিড়ালের শোষক শ্রেণির ভণ্ডামির প্রতি শ্লেষ প্রকাশ।বিড়াল যখন বলে- "আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি?" তখন সমাজের মূল কাঠামোর দিকেই আঙুল তোলা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র বিড়ালের জবানবন্দীতে দেখিয়েছেন যে, সমাজে যারা বড় বড় নীতি কথা বলে, তারাই আসলে দরিদ্রের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে নিজেদের ভাণ্ডার পূর্ণ করে। বিড়ালের শ্লেষাত্মক উক্তি-
"অধম চোরের নহে-চোর যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর।"
আসলে এখানে লেখক বুঝিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা ও কৃপণতা থেকেই চুরির মতো অপরাধের জন্ম হয়।
•বিচার ব্যবস্থার অসারতা ও বিদ্রূপ প্রকাশ কর বিড়াল।প্রবন্ধে বিচার ব্যবস্থার প্রহসনকে লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে আক্রমণ করেছেন। চোরকে দণ্ড দেওয়ার আগে বিচারকের নিজের নৈতিকতা নিয়ে বিড়াল প্রশ্ন তুলেছে। তার মতে, বিচারক যদি নিজে তিনদিন উপবাস করে বিচারাসনে বসতেন, তবে তিনি চোরের ক্ষুধা বুঝতে পারতেন। বিড়ালের এই উক্তিটি সমাজতত্ত্বের এক অমোঘ সত্য। আর সেখানে আমারা দেখি-
"প্রহারের কিঞ্চিৎ সার্থকতা আছে। আমি না হয় মার খাইলাম, কিন্তু তোমার তাতে কি লাভ?"
•সাম্যবাদী দর্শনের উন্মেষ প্রকাশ কর বিড়াল।বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রবন্ধে যে 'সোশ্যালিজম' বা সাম্যবাদের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা সমকালীন প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত সাহসী। বিড়াল দাবি করেছে যে, পৃথিবীর সব সম্পদ সবার জন্য। ধনীদের উদরপূর্তি যখন দরিদ্রের হাহাকারের কারণ হয়, তখন সেই সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। বিড়ালের কণ্ঠে ঝরে পড়ে সাম্যের সুর। তাই বিড়ালকে বলতে শুনি-
"পরোপকারই পরম ধর্ম। ... ক্ষুধার্তকে অন্নদান করাই পরম ধর্ম।"
•কমলাকান্তের পরাজয় ও চেতনার জাগরণ ঘটেছে বিড়াল প্রবন্ধে।বিড়ালের যুক্তির কাছে কমলাকান্তের মতো তথাকথিত শিক্ষিত ও সমাজ সচেতন মানুষও পরাজিত হয়। লাঠি হাতে বিড়ালকে মারতে গিয়েও কমলাকান্ত থেমে যান, কারণ তিনি বুঝতে পারেন-বিড়ালের যুক্তিতে কোনো ফাঁকি নেই। এই পরাজয় আসলে পুঁজিবাদের নৈতিক পরাজয়। কমলাকান্তের স্বীকারোক্তি- "বুঝিলাম যে, মার্জার পণ্ডিতা ঠিক বলেছে।"-এর মাধ্যমেই প্রবন্ধের সামাজিক উদ্দেশ্য সফল হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে,বিড়াল' কেবল হাস্যরসাত্মক নকশা নয়, এটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রগতিশীল চিন্তার প্রতিফলন। হাস্যরসের মোড়কে তিনি সমাজের সেই নগ্ন সত্যকে উন্মোচন করেছেন যেখানে অভাব মানুষকে চোর বানায় আর উদ্বৃত্ত সম্পদ মানুষকে অমানুষ করে তোলে। বঙ্কিমচন্দ্রের এই শ্লেষাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবন্ধটিকে কেবল বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক রচনাই করেনি, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক দলিলে পরিণত করেছে।
Comments
Post a Comment