দেবী অন্নদা মঙ্গলকাব্যের এক ব্যতিক্রমী দেবচরিত্র আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা, মেজর সিলেবাস)।
আমি জানি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য মূলত দেব মহিমা প্রচারের কাব্য। চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলের দেবীরা সাধারণত উগ্র, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং নিজ পূজা প্রচারের জন্য মর্ত্যে ভক্তদের ওপর অবর্ণনীয় কষ্ট দিতে দ্বিধা করেন না।কিন্তু ভারতচন্দ্র রায়ের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের প্রধানা দেবী অন্নদা এই গতানুগতিক ছক থেকে অনেকটাই আলাদা। অর্থাৎ-মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক দেবচরিত্রের তুলনায় দেবী অন্নদার স্বাতন্ত্র্য ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যময়ী।আর সেখানে-
•দেবী অন্নদা প্রতিহিংসার পরিবর্তে মাতৃরূপ ও করুণাময়ী।অন্যান্য মঙ্গলকাব্যে দেবী চণ্ডী বা মনসা ভয় দেখিয়ে পূজা আদায় করেন। ব্যাধ কালকেতু বা বণিক চাঁদ সদাগরকে দেবী পূজা দিতে বাধ্য করেছিলেন চরম লাঞ্ছনার মাধ্যমে। কিন্তু দেবী অন্নদা অনেক বেশি নমনীয় ও করুণাময়ী।তাঁর চরিত্রে প্রতিহিংসার চেয়ে বাৎসল্য ও মমতা বেশি প্রকট। তিনি কাউকে ধ্বংস করে নয়, বরং ভালোবেসে ও আশ্রিতকে রক্ষা করে নিজের দেবত্ব প্রমাণ করেছেন। আর সেই কারণেই-
•লৌকিকতা ও মানবিকতার সংমিশ্রণ ঘটেছে দেবী অন্নদা চরিত্রটিতে।অন্নদা চরিত্রের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অত্যধিক মানবিকীকরণ। ঈশ্বরী পাটনীর নৌকায় পার হওয়ার সময় দেবীর যে রূপ আমরা দেখি, তা লৌকিক জগতের একজন সাধারণ দুঃখী রমণীর মতো। তাঁর ছদ্মবেশ ও কথা বলার ঢঙে দেবত্বের গাম্ভীর্যের চেয়ে রক্ত-মাংসের নারীর অভিমান বেশি ফুটে উঠেছে। ভারতচন্দ্র দেবীকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে বাঙালির ঘরের আপনজন করে তুলেছেন। শুধু তাই নয়-
•গৃহিণী ও জননী সত্তাময়ী দেবী অন্নদা চরিত্রটি।শিবের সঙ্গে অন্নদার দাম্পত্য কলহ বা অভিমান মঙ্গলকাব্যের চিরন্তন ছক অনুসরণ করলেও, অন্নদা চরিত্রে এক ধরনের স্থিরতা ও আভিজাত্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি কেবল সংকীর্ণ পূজা প্রচারের দেবী নন, তিনি অন্নদাত্রী—যিনি জগতকে পোষণ করেন। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’—ঈশ্বরী পাটনীর এই বর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দেবী অন্নদার মাতৃত্বের মহিমা ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আবার-
• রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সক্রিয়তা লক্ষ্যণীয় দেবীর চরিত্রে।মঙ্গলকাব্যের দেবীরা সাধারণত ব্যক্তির জীবনে প্রভাব ফেলেন, কিন্তু অন্নদা দেবীর প্রভাব বিস্তৃত রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও। তিনি ভবানন্দ মজুমদারকে আশীর্বাদ করছেন দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের রোষ থেকে রক্ষা করতে। এখানে দেবী অন্নদা কেবল আধ্যাত্মিক শক্তি নন, তিনি একটি রাজবংশের উত্থান ও সামাজিক স্থিতাবস্থার নিয়ন্ত্রক। আসলে-
রায় গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের দেবী অন্নদা অনেকবেশী শান্ত, করুণাময়ী, আভিজাত্যপূর্ণ নারী চরিত্র। যিনি ভক্তকে রক্ষা ও জগতকে পোষণ করেন।তাই তাঁর মধ্যে ঘরোয়া নারীসুলভ গুণাবলি অনেক বেশি লক্ষণীয়। সুতরাং এই দেবী অন্নদা সরস, মার্জিত ও শ্লেষাত্মকযয় চরিত্র।
পরিশেষে বলতে পারি যে, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর দেবী অন্নদাকে মঙ্গলকাব্যের গতানুগতিক ‘দাপুটে’ দেবী হিসেবে না এঁকে এক নমনীয় ও স্নেহময়ী প্রতিমা হিসেবে গড়েছেন। তাঁর চরিত্রে দেবত্বের অলৌকিকতা অপেক্ষা মানবিক রস ও বাৎসল্য বেশি প্রধান হয়ে ওঠায় তিনি সমগ্র মঙ্গলকাব্য ধারায় এক সার্থক ব্যতিক্রম। আঠারো শতকের নাগরিক রুচি ও পরিশীলিত বোধ দেবীর চরিত্রে যে মার্জিত রূপ দান করেছে, তাই তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment