আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘আপন কথা’-য় তাঁর শৈশবের জগতটি গড়ে উঠেছিল বাড়ির অন্দরমহল এবং একদল বিচিত্র মানুষের সাহচর্যে। এই মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলেন পরিচারিকা পদ্মদাসী। লেখকের বর্ণনায় সে ছিল ‘অন্ধকারের মতো কালো’, কিন্তু সেই অন্ধকারের বুক চিরে সে লেখকের শিশুমনে যে কল্পনার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা ছিল এক অনন্য সৃষ্টি।
১. পদ্মদাসীর বাহ্যিক রূপ ও স্বভাব:
পদ্মদাসী ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এক পুরনো পরিচারিকা। লেখক তাকে বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত কালো এবং গম্ভীর হিসেবে। সে খুব একটা কথা বলত না, কিন্তু তার এক অমোঘ আকর্ষণ ছিল। লেখক বলেছেন— "কোন গাঁয়ের কোন ঘর ছেড়ে এসেছিল অন্ধকারের মতো কালো আমার পদ্মদাসী।" এই কালোর মধ্যে লেখক কোনো কুৎসিত রূপ দেখেননি, বরং দেখেছিলেন এক স্নিগ্ধ ও রহস্যময় গভীরতা।
২. কল্পনার জগত তৈরি:
পদ্মদাসী ছিল রূপকথার গল্পের খনি। ঝড়ের রাতে বা বৃষ্টির দিনে পদ্মদাসী যখন গল্প বলত, তখন শিশুর মনের অন্ধকার কোণগুলো এক অদ্ভুত আলোয় ভরে উঠত।
* গল্পের মায়াজাল: সে রাজার ছেলে, কোটাল পুত্র, পক্ষীরাজ ঘোড়া আর সুয়োরানী-দুয়োরানীর গল্প এমনভাবে শোনাত যে অবনীন্দ্রনাথের চোখের সামনে এক রঙিন জগত খুলে যেত।
* বিস্ময়ের সঞ্চার: তার গল্পের মাধ্যমেই লেখক প্রথম চেনা জগতের বাইরের এক অজানা পৃথিবীকে চিনতে শেখেন। পদ্মদাসী কেবল কাজ করত না, সে ছিল লেখকের শৈশবের 'স্বপ্ন-সঞ্চারিনী'।
৩. শিল্পীসত্তার জাগরণ:
অবনীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে যে জাদুকরী চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন, তার বীজ বপন করা হয়েছিল পদ্মদাসীর গল্পের মাধ্যমে।
* চিত্ররূপময় বর্ণনা: পদ্মদাসীর গল্পের প্রতিটি চরিত্র শিশুর মনে এক একটি ছবি তৈরি করত। লেখক পরবর্তী জীবনে যখন ‘ক্ষীরের পুতুল’ বা ‘রাজকাহিনী’ লিখেছেন, তখন তাঁর সেই লেখনীতে পদ্মদাসীর বলা গল্পের রস ও ভঙ্গি পরোক্ষভাবে কাজ করেছে।
* অন্ধকারের গুরুত্ব: পদ্মদাসী নিজে কালো হলেও সে শিশুর জীবনে আলোর কাজ করেছে। লেখক অন্ধকারকে ভয় পেতে শেখেননি, বরং অন্ধকারের নিস্তব্ধতার মধ্যে যে সৌন্দর্য আর রূপকথা লুকিয়ে থাকে, তা পদ্মদাসীর মাধ্যমেই আবিষ্কার করেছেন।
৪. মানবিক বন্ধন ও নিরাপত্তা:
পদ্মদাসী কেবল গল্পকার ছিল না, সে ছিল শিশুর আশ্রয়। মা-বাবার থেকে দূরে অন্তঃপুরের শিশুদের কাছে পদ্মদাসীদের মতো পরিচারিকারাই ছিল প্রধান অভিভাবক। তার সেই গম্ভীর শাসনের আড়ালে ছিল অসীম মমতা। এই মমতাময় নিরাপদ আশ্রয়েই লেখকের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
৫. গদ্যরীতির সার্থকতা:
পদ্মদাসীকে নিয়ে করা বর্ণনায় অবনীন্দ্রনাথের গদ্যরীতি তুঙ্গে উঠেছে। তিনি যেভাবে 'কালো' আর 'অন্ধকার'-কে মহিমান্বিত করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল।
> "কালো মেঘ যেমন জল দেয়, তেমনি কালো পদ্মদাসী আমাদের তৃষ্ণার্ত শৈশবকে গল্পের সুধায় ভরিয়ে দিত।"
>
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, পদ্মদাসী চরিত্রটি অবনীন্দ্রনাথের জীবনে কেবল একজন পরিচারিকা ছিল না, সে ছিল তাঁর কল্পনার আদি জননী। ‘অন্ধকারের মতো কালো’ পদ্মদাসী আসলে লেখকের মনোজগতে সৌন্দর্যের প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিল। তাঁর শিল্পীমনের গঠনে এবং সৃজনশীলতার বিকাশে পদ্মদাসীর দান অপরিসীম, যা ‘আপন কথা’ গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।
পরামর্শ: ৫ নম্বরের টীকা হিসেবে আসলেও আপনি এই পয়েন্টগুলো সংক্ষেপে লিখতে পারেন। এছাড়া এই চ্যাপ্টার থেকে আর কোনো অংশ (যেমন: 'পুবের বারান্দা' বা 'প্যারী সরকা
র') আপনার প্রয়োজন কি?
Comments
Post a Comment