তেল-নুন-লকড়ি প্রবন্ধে দুই সভ্যতার তুলনামূলক আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)।
প্রমথ চৌধুরীর ‘তেল-নুন-লকড়ি’ প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য মননশীল সৃষ্টি। যেখানে লেখক উনিশ শতকীয় ইউরোপীয় সভ্যতা এবং চিরাচরিত ভারতীয় (তথা বঙ্গীয়) গ্রামীণ সভ্যতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন।আর সেখানে প্রমথ চৌধুরী তাঁর এই প্রবন্ধে ‘তেল-নুন-লকড়ি’ শব্দবন্ধটিকে মানুষের জীবনধারণের অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, জীবনের আসল সত্য কোনো বড় দর্শনে নয়, বরং এই অতি সাধারণ সাংসারিক বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি দুটি সভ্যতার তুলনা করেছেন।আর সেই তুলনায় আমরা দেখি-
ইউরোপীয় সভ্যতা ছিল ভোগের ও জাঁকজমকের সভ্যতা। আসলে ইউরোপীয় সভ্যতাকে প্রমথ চৌধুরী দেখেছেন এক অস্থির এবং অতি-বিলাসী সভ্যতা হিসেবে।এই সভ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
ইউরোপীয় সভ্যতা হলো বাহ্যিক আড়ম্বর। এই সভ্যতার ভিত্তি হলো ‘প্রয়োজন’ বাড়ানো। সেখানে জীবন শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং নিত্যনতুন বিলাসিতার খোরাক জোগাতে ব্যস্ত।
ইউরোপীয় সভ্যতা অশান্তি ও সংঘর্ষময়। লেখক দেখিয়েছেন যে, ইউরোপীয়রা তেল-নুন-লকড়ির চেয়ে ‘মদ-মাংস-গোলাবারুদ’ নিয়ে বেশি আগ্রহী। ফলে তাদের সভ্যতায় শান্তি কম, লড়াই বেশি।আর সেখানে প্রাধান্য পায়-
ইউরোপীয় ভোগবাদ। সেখানে মানুষের সুখ নির্ভর করে কত বেশি বস্তু সে ভোগ করতে পারছে তার ওপর।
•ভারতীয় সভ্যতা হলো ত্যাগের ও সরলতার সভ্যতা। আসলে প্রাচীন ভারতীয় বা বাঙালির চিরাচরিত সভ্যতা ছিল অনেক বেশি শান্ত ও সংযমী। এর মূল দিকগুলি হলো-
ভারতীয় বাঙালি জাতি ছিল অল্পে সন্তুষ্টি।আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন ছিল ‘তেল-নুন-লকড়ি’র মতো অতি সাধারণ জিনিসের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের চাহিদা ছিল সীমিত, তাই জীবনে শান্তি ছিল অটুট।
বাঙালি জাতির ছিল অনাড়ম্বর জীবন। ভারতীয় সভ্যতায় বিলাসিতার চেয়ে প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। দারিদ্র্য থাকলেও সেখানে মনের শান্তি বা সন্তুষ্টির অভাব ছিল না।
ধর্ম ও দর্শন ছিল বাঙালি জাতির প্রাণের সম্পদ। দেশের সভ্যতা আধ্যাত্মিকতা ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যা মানুষকে লোভ থেকে দূরে রাখত।আর সেখানে দুই সভ্যতার তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই-
ক)ইউরোপীয়দে মূলমন্ত্র হলো ভোগ এবং অধিকার বিস্তার।• কিন্তু ভারতীয়দের কাছে মূলমন্ত্র হলো ত্যাগ এবং সন্তুষ্টি।
খ) ইউরোপে ‘বিলাসিতা’ই হলো জীবনের আসল প্রয়োজন। •কিন্তু - ভারতীয়দের ‘তেল-নুন-লকড়ি’ জুটলেই মানুষ ধন্য।
গ) ইউরোপীয়দের মানসিকতা পররাজ্য গ্রাস এবং বৈষয়িক উন্নতি। •কিন্তু-আত্মিক শান্তি এবং পারিবারিক বন্ধন।
ঘ) ইউরোপীয়দের মনে ছিল অতৃপ্তি ও বিশ্বযুদ্ধের মতো মহাবিনাশ। •কিন্তু- ভারতীয়দের মনে ছিল শান্তিময় বার্তা তবে বর্তমানে অনুকরণপ্রিয় হয়ে জগাখিচুড়ি অবস্থা। |
প্রবন্ধের মূল সুর ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
প্রমথ চৌধুরী আক্ষেপ করে জানিয়েছেন যে, আমরা আজ না পারছি ইউরোপীয়দের মতো কর্মঠ হতে, না পারছি পূর্বপুরুষদের মতো সন্তুষ্ট থাকতে। আমরা আমাদের ‘তেল-নুন-লকড়ি’র সহজ জীবন হারিয়ে ইউরোপের অনুকরণ করতে গিয়ে এক বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছি। লেখকের মতে, ধার করা সভ্যতা দিয়ে কোনো জাতি বড় হতে পারে না। নিজের মাটির অভাব-অভিযোগ মিটিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার মধ্যেই সার্থকতা।
পরিশেষে বলা যায় যে, ‘তেল-নুন-লকড়ি’ কেবল রান্নার সরঞ্জাম নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। প্রমথ চৌধুরী ইউরোপীয় সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে নিজের অস্তিত্বকে চেনার ওপর জোর দিয়েছেন। দুই সভ্যতার এই তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তিনি আধুনিক মানুষকে শেকড়ে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
প্রমথ চৌধুরীর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'বইপড়া' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) পঞ্চম সেমিস্টারের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী, সাহিত্যচর্চাকে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ বলার পেছনে প্রাবন্ধিকের যুক্তিগুলো নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
"সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।"।-বইপড়া প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী কেন এ কথা বলেছেন তা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রমথ চৌধুরীর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'বইপড়া' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। যেখানে প্রমথ চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধে প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষার অসারতা প্রমাণ করে সাহিত্যচর্চার অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর এই অভিমতের মূলে রয়েছে কয়েকটি জোরালো যুক্তি ছিল।আর সেই যুক্তিগুলি হলো-
•প্রাবন্ধিকের মতে, শিক্ষা মানে কেবল তথ্য আহরণ নয়, বরং মনের প্রসার। বিজ্ঞান, দর্শন বা ইতিহাস মানুষকে নির্দিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান দেয়, কিন্তু সাহিত্য মানুষের মনকে সজাগ ও সবল করে তোলে। সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষের হৃদয়ের পূর্ণ বিকাশ ঘটে, যা প্রকৃত শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
•স্বশিক্ষিত হওয়ার মাধ্যম হিসেবে প্রমথ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, "সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।" বিদ্যালয়ের ধরাবাঁধা সিলেবাস বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বিদ্যা মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগাতে পারে না। সাহিত্যচর্চা মানুষ নিজের খুশিতে করে, আর এই স্বেচ্ছামূলক চর্চাই তাকে প্রকৃত জ্ঞানালোকের সন্ধান দেয়।
•লাইব্রেরির গুরুত্ব ও স্কুল-কলেজের সীমাবদ্ধতা হিসেবে প্রাবন্ধিক অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে বলেছেন যে, লাইব্রেরির স্থান স্কুল-কলেজের উপরে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন-
১) স্কুল-কলেজে পাস করার তাগিদে ছাত্ররা 'নোট' মুখস্থ করে, ফলে তাদের মৌলিক চিন্তা নষ্ট হয়ে যায়।
২) লাইব্রেরিতে মানুষ নিজের রুচি অনুযায়ী সাহিত্য পাঠ করে মনের ক্ষুধা মেটায়।
৩) সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ জগতের আনন্দ ও বেদনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারে।
•মনের হাসপাতাল হিসেবে সাহিত্য।লেখক ব্যঙ্গ করে বলেছেন, হাসপাতাল যেমন দেহের রোগ সারে, লাইব্রেরি বা সাহিত্যচর্চা তেমনি মনের জড়তা দূর করে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি অনেকটা 'জোর করে খাওয়ানো'র মতো, যা জীর্ণ না হয়ে বদহজমের সৃষ্টি করে। সাহিত্যচর্চা সেই অরুচি দূর করে মানুষের সুপ্ত মনকে সজীব রাখে।
•জীবনের পূর্ণতা আনতে অর্থকরী বিদ্যা বা পেশাগত শিক্ষা মানুষকে জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু জীবনকে উপভোগ করার শক্তি দেয় একমাত্র সাহিত্য। দর্শন বা বিজ্ঞান বুদ্ধিকে শানিত করে, কিন্তু সাহিত্য মানুষের অনুভূতি ও কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে। এই অনুভূতির চর্চা ছাড়া শিক্ষা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, প্রমথ চৌধুরী কেবল শখের বশে সাহিত্য পড়তে বলেননি। তিনি মনে করতেন, জাতির প্রাণের স্পন্দন যদি অনুভব করতে হয়, তবে সাহিত্যের সান্নিধ্যে আসতেই হবে। তাঁর মতে, সাহিত্যের ভাণ্ডারে সঞ্চিত থাকে মানুষের হৃদয়ের ধন। তাই তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, সাহিত্যচর্চাই হলো শিক্ষার সর্বপ্রধান ও আবশ্যিক অঙ্গ।
> মূল সূত্র: "শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজারদর নেই। এই কারণেই ডেমোক্রেসি সাহিত্যের সার্থকতা বোঝে না, বোঝে শুধু অর্থের সার্থকতা।" — প্রমথ চৌধুরী
>
আপনি কি এই প্রবন্ধের অন্য কোনো বিশেষ দিক (যেমন—লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা বা শিক্ষা পদ্ধতির সমালোচনা) নিয়ে আরও
বিস্তারিত জানতে চান?
আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির সুবিধার্থে 'বইপড়া' প্রবন্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছোট (২ নম্বর) ও মাঝারি (৫ নম্বর) প্রশ্ন এবং উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহ:
১. "সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত"— প্রাবন্ধিকের এই অভিমতের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
* উত্তর সংকেত: এখানে প্রাবন্ধিক বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত শিক্ষা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষক কেবল পথপ্রদর্শক মাত্র; ছাত্রকে নিজের কৌতূহল ও মেধা দিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হয়। জোর করে বিদ্যা গেলালে তা অন্তরের মণিকোঠায় পৌঁছায় না, তাই স্বীয় প্রচেষ্টায় অর্জিত জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ।
২. "লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চেয়ে কিছু কম নয়"— লেখক কেন এই তুলনা করেছেন?
* উত্তর সংকেত: লেখক মনে করেন শরীর অসুস্থ হলে আমরা হাসপাতালে যাই, কিন্তু আমাদের মনের যে জড়তা বা ব্যাধি, তা দূর করার জন্য লাইব্রেরি বা সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মনে যে অরুচি তৈরি করে, লাইব্রেরি সেই অরুচি দূর করে মনকে পুনরুজ্জীবিত করে।
৩. "বইপড়া প্রবন্ধে" প্রমথ চৌধুরী প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার যে সমালোচনা করেছেন তা সংক্ষেপে লেখো।
* উত্তর সংকেত: লেখক মনে করেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা মুখস্থ বিদ্যা নির্ভর। এখানে নোট পড়ে পাস করাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে শিক্ষার্থীর মৌলিক চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যবস্থা 'পাস' করায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত 'মানুষ' গড়তে ব্যর্থ।
২ নম্বরের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (নমুনা উত্তরসহ):
১. প্রমথ চৌধুরীর মতে ডেমোক্রেসির দোষ কী?
* উত্তর: ডেমোক্রেসি কেবল অর্থের সার্থকতা বোঝে এবং সবকিছুকে বাজারের দরে পরিমাপ করতে চায়। ফলে এটি সাহিত্যের মতো বিমূর্ত ও মহৎ বিষয়ের গুরুত্ব বুঝতে অক্ষম।
২. "সাহিত্যের সার্থকতা শিক্ষার চেয়েও বেশি"— কেন?
* উত্তর: শিক্ষা কেবল জ্ঞান দেয়, কিন্তু সাহিত্য আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের মনকে সজীব ও সজাগ রাখে। সাহিত্যের ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না বলে এটি বেশি মূল্যবান।
৩. লেখক কেন লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের উপরে স্থান দিয়েছেন?
* উত্তর: কারণ স্কুল-কলেজে ছাত্ররা অনিচ্ছাসত্ত্বেও নির্দিষ্ট পাঠ্যবই পড়তে বাধ্য হয়, কিন্তু লাইব্রেরিতে তারা নিজের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়।
৪. "বইপড়া" প্রবন্ধটি লেখকের কোন মূল প্রবন্ধ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
* উত্তর: প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর 'প্রবন্ধ সংগ্রহ' নামক গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে।
৫. কাদের জন্য কাব্যচর্চা বিলাসিতা বলে লেখক উল্লেখ করেছেন?
* উত্তর: যারা কেবল বৈষয়িক উন্নতি বা অর্থ উপার্জনকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করেন, তাদের কাছে কাব্যচর্চা করাটা অনেকটা বিলাসিতার মতো মনে হয়।
পরামর্শ: আপনার সেমিস্টার পরীক্ষায় ১০ নম্বরের প্রশ্নের উত্তরের মাঝখানে এই ছোট ছোট পয়েন্টের মূল ভাবনাগুলো যুক্ত করে দিলে উত্তরটি আরও সমৃদ্ধ হবে। এই প্রশ্নগুলো ভালোভাবে পড়ে রাখলে আপনি ৫ বা ২ নম্বরের উত্তরের জন্যও প্রস্তুত থাকবেন।
আপনার কি আরও অন্য কোনো প্রবন্ধ বা কবিতার প্র
শ্নের উত্তর প্রয়োজন?
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাসে প্রমথ চৌধুরীর 'সবুজ পত্রের মুখপত্র' প্রবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার জিজ্ঞাসিত উদ্ধৃতিটি এই প্রবন্ধের একটি মূল ভিত্তি। নিচে ১০ নম্বরের উপযোগী একটি আদর্শ উত্তর প্রস্তুত করে দেওয়া হলো:
"ইংরেজি শিক্ষার গুণেই আমরা দেশের লুপ্ত অতীতের পুনরুদ্ধারে ব্রতী হয়েছি।"- সবুজ পত্রের মুখপত্র প্রবন্ধে লেখকের এই মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর সিলেবাস)
প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'সবুজ পত্র' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (১৩২১ বঙ্গাব্দ) এই মুখপত্রটি লিখেছিলেন। এখানে তিনি আধুনিক বাঙালির মনন গঠনে এবং ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়নে ইংরেজি শিক্ষার ইতিবাচক ভূমিকার কথা ব্যক্ত করেছেন।
১. ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
প্রাবন্ধিকের মতে, ইংরেজি শিক্ষা বাঙালি মানসে কেবল বিদেশি ভাষা শেখায়নি, বরং এক নতুন যুগচেতনা বা আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে। মধ্যযুগীয় স্থবিরতা কাটিয়ে বাঙালি যখন ইউরোপীয় সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এলো, তখন তার মধ্যে এক প্রবল আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হলো। এই জিজ্ঞাসাই তাকে নিজের শেকড়ের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে।
২. যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির উন্মেষ
ইংরেজি শিক্ষার অন্যতম গুণ হলো যুক্তিবাদ (Rationalism)। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে যুক্তি দিয়ে সব কিছু বিচার করতে শিখল। এই যুক্তিবাদী মনোভঙ্গিই আমাদের বাধ্য করেছে ধুলোচাপা পড়ে থাকা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও সাহিত্যকে নতুন করে পাঠ করতে। ইংরেজি শিক্ষার আলোতেই আমরা আমাদের লুপ্ত গৌরবকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাজাতে পেরেছি।
৩. প্রতীচ্যের আয়নায় প্রাচ্যের দর্শন
প্রমথ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন যে, অন্যকে জানার মাধ্যমেই নিজেকে চেনা যায়। ইংরেজি শিক্ষার ফলে আমরা পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে বুঝতে পারলাম যে, আমাদের দেশের উপনিষদ বা কালিদাসের কাব্য বিশ্বসাহিত্যে কতটা উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত। অর্থাৎ, পাশ্চাত্য শিক্ষার চশমা দিয়েই আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য নতুন করে আবিষ্কার করেছি।
৪. লুপ্ত অতীতের পুনরুদ্ধার
বাংলার নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিরা (যেমন—রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্র) সবাই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাঁরাই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে ভারতের প্রাচীন সভ্যতার মহিমা তুলে ধরেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র বা রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ইতিহাসবিদরা পাশ্চাত্য প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতির সাহায্যেই ভারতের মাটির তলায় চাপা পড়া ইতিহাস উদ্ধার করেছেন। প্রমথ চৌধুরীর মতে, এই যে ঐতিহ্যের 'পুনরুদ্ধার', তা ইংরেজি শিক্ষার দান ছাড়া সম্ভব ছিল না।
৫. গতির সঞ্চার ও জড়তা মুক্তি
লেখক মনে করতেন, ইংরেজি শিক্ষা আমাদের মনের জড়তা দূর করেছে। 'সবুজ পত্র' পত্রিকাটিও সেই সজীবতা ও যৌবনের প্রতীক। ইংরেজি শিক্ষার গুণে আমাদের চিন্তা একমুখী বা সংকীর্ণ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বিশ্বমুখী। অতীতকে কেবল অন্ধভাবে ভক্তি না করে, তাকে আধুনিক জীবনের প্রয়োজনে কাজে লাগানোই ছিল এই শিক্ষার প্রকৃত গুণ।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, প্রমথ চৌধুরী ইংরেজি শিক্ষার অন্ধ অনুকরণকে প্রশ্রয় দেননি, বরং তার ভেতরের সারবস্তু বা 'প্রাণশক্তি'কে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ইংরেজি শিক্ষা আমাদের ঘরমুখো মনকে বিশ্বমুখী করেছে এবং সেই বিশ্বজনীন দৃষ্টি দিয়েই আমরা আমাদের দেশের লুপ্ত গৌরব ও প্রাচীন ঐতিহ্যকে সগৌরবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।
> মূল সারকথা: ইংরেজি শিক্ষা আমাদের কাছে কোনো পরগাছা নয়, বরং এটি একটি চাবিকাঠি যা দিয়ে আমরা আমাদের ঐতিহ্যের বন্ধ দরজা খুলেছি।
>
পরীক্ষার জন্য টিপস:
* উত্তরের শুরুতে অবশ্যই উল্লেখ করবেন যে প্রবন্ধটি 'সবুজ পত্র' পত্রিকার মুখপত্র হিসেবে রচিত।
* ১০ নম্বরের জন্য উত্তরটিকে ৩-৪টি প্যারাগ্রাফে ভাগ করে লিখবেন।
* মনে রাখবেন, প্রমথ চৌধুরীর মূল বক্তব্য ছিল—ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে আমরা যেন 'সাহেব' না হয়ে বরং খাঁটি 'বাঙালি' হতে পারি এবং নিজেদের ঐতিহ্যকে চিনতে পারি।
এই প্রবন্ধ থেকে আর কোনো বিশ্লেষণ বা অন্য কোনো প্রবন্ধের (যেমন—'যৌবনে দাও রাজটিকা') নোটস কি আপনার প্রয়োজন?
Comments
Post a Comment