Skip to main content

বিদ্যাসাগরের 'সীতার বনবাস' গ্রন্থে করুণ রসের প্রাধান্য আলোচনা করো।

বিদ্যাসাগরের 'সীতার বনবাস' গ্রন্থে করুণ রসের প্রাধান্য দেখা যায় যা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস)

       আমরা জানি যে,উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর 'সীতার বনবাস' গ্রন্থে বাল্মীকির রামায়ণ ও ভবভূতির উত্তররামচরিতের প্রেক্ষাপট গ্রহণ করলেও, এর অন্তঃপুরে প্রবহমান রয়েছে এক গভীর কারুণ্য ও বেদনাবোধ। সীতার ত্যাগ, রামের রাজধর্মের নিষ্ঠুরতা এবং নারী হৃদয়ের হাহাকার এই গ্রন্থকে 'করুণ রসের' এক আকর গ্রন্থে পরিণত করেছে।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'সীতার বনবাস' (১৮৬০) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য শোকগাথা। ভবভূতির 'উত্তররামচরিত' নাটকের আধারে রচিত হলেও বিদ্যাসাগর তাঁর সহজাত করুণরসে সিক্ত করে কাহিনীটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

         সীতার বনবাস গ্রন্থের সূচনাতেই দেখা যায়, গর্ভবতী সীতা সুখের স্বপ্নে বিভোর, অথচ রাজা রামচন্দ্র লোকাপবাদের ভয়ে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রামের হৃদয়ের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সীতার অজ্ঞতা এক করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিদ্যাসাগর লিখেছেন— "হা নাথ! কেন আমায় এই নিদারুণ বিপদে ফেলিয়া চলিয়া গেলে?" সীতার এই হাহাকার পাঠকের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে।

         সীতাকে যখন বাল্মীকির আশ্রমের কাছে গঙ্গার তীরে রেখে আসা হয়, তখন লক্ষ্মণের কাছে নির্বাসনের প্রকৃত সংবাদ শুনে সীতা মূর্ছিত হয়ে পড়েন। একজন নিরপরাধা নারীর প্রতি এই চরম অবিচার করুণ রসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। লক্ষ্মণের প্রস্থানের পর জনশূন্য বনভূমিতে সীতার একাকী কান্না করুণ রসের প্রবাহকে তীব্রতর করে তোলে।

          কেবল সীতার দুঃখ নয়, বিদ্যাসাগর রামচন্দ্রের অন্তর্বেদনাকেও নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজা হিসেবে তিনি সীতাকে ত্যাগ করলেও স্বামী হিসেবে তাঁর হৃদয় ছিল রক্তাক্ত। অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় সীতার স্বর্ণপ্রতিমা নির্মাণ রামের সেই চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ-বেদনা ও করুণ আর্তিকেই তুলে ধরে। রামের উক্তি— "হা জানকি! তুমি বিনা আমার অযোধ্যাপুরী আজ অন্ধকার"।গ্রন্থটিকে বিষাদময় করে তোলে। আসলে-

          বিদ্যাসাগর কেবল চরিত্রগুলোর মুখ দিয়েই করুণ রস পরিবেশন করেননি, বরং বর্ণনার মাধ্যমেও এক বিষণ্ণ পরিবেশ তৈরি করেছেন। তপোবনের শান্ত পরিবেশ সীতার দুঃখের সঙ্গে সমব্যাথী হয়ে ওঠে। বৃক্ষলতা, পশুপাখি যেন সীতার বনবাসে অশ্রুপাত করে। বিদ্যাসাগরের অলঙ্কৃত গদ্যরীতি এই বিষাদকে এক ধ্রুপদী মহিমা দান করেছে। আবার-

          অনেক সমালোচক মনে করেন, বিদ্যাসাগর যখন এই গ্রন্থটি লিখছেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিধবা বিবাহ আন্দোলন নিয়ে সমাজের এক অংশের নিষ্ঠুরতা এবং নিজের নিঃসঙ্গতা হয়তো সীতার চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। তাই তাঁর ভাষায় করুণ রস কেবল অলঙ্কার হিসেবে আসেনি, এসেছে হৃদয়ের গভীর থেকে।

        বিদ্যাসাগরের গদ্য ছিল ধ্বনিমাধুর্যে পূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। তাঁর দীর্ঘ সমাসবদ্ধ পদ এবং বিষাদমাখা শব্দচয়ন (যেমন— 'অসহ্য শোকাবেগ', 'হৃদয়বিদারক বিলাপ', 'নয়নজল') করুণ রসকে আরও মূর্ত করে তুলেছে। করুণ রসের বর্ণনায় তাঁর ভাষা যেমন গম্ভীর, তেমনই তা মরমী।

           পরিশেষে বলা যায় যে , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সীতার পৌরাণিক কাহিনীকে নিছক অনুবাদে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে বাঙালির ঘরের মেয়ের চিরন্তন দুঃখের কাহিনীতে রূপান্তরিত করেছেন। 'সীতার বনবাস' গ্রন্থে সীতার ধৈর্য ও ত্যাগের আড়ালে যে অশ্রুজল রয়েছে, তা বিদ্যাসাগরের সুনিপুণ গদ্যের ছোঁয়ায় বিশ্বজনীন করুণ রসে সিক্ত হয়েছে। এই কারণেই গ্রন্থটি আজও বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য বিয়োগান্তক আখ্যান হিসেবে সমাদৃত।

Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...