মনসামঙ্গল কাব্যের উদ্ভব,৪জন প্রাক চৈতন্য যুগের কবি ও শ্রেষ্ঠ কবির কবি-কৃতিত্ব (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের,প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
• মনসামঙ্গল কাব্যের উদ্ভব ও পটভূমিঃ মনসামঙ্গল কাব্যধারার উদ্ভব মূলত আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণের ফল। মধ্যযুগের বাংলায় মনসা ছিলেন সর্পভয়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লৌকিক দেবী।আর সেখানে -
• সামাজিক প্রেক্ষাপট: পাল ও সেন যুগের পরবর্তী সময়ে যখন বাংলার হিন্দু সমাজ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন লৌকিক দেব-দেবীদের মাহাত্ম্য প্রচার শুরু হয়।
• ধর্মীয় প্রেক্ষাপট: আর্য পুরাণের 'জরৎকারু' বা 'কদ্রু-বিনতা'র কাহিনীর সঙ্গে অনার্য ব্রতকথা ও কৃষিজীবী মানুষের বিশ্বাস মিলেমিশে এই কাব্যের জন্ম দেয়। মূলত চাঁদ সদাগরের মতো একনিষ্ঠ শিবভক্তের দর্প চূর্ণ করে মনসার পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনীই এর মূল উপজীব্য।
প্রাক-চৈতন্য যুগের চারজন কবির নাম
মনসামঙ্গল কাব্যধারার আদি কবিদের অধিকাংশই চৈতন্যপূর্ব যুগের। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারজন হলেন-
•কানা হরিদত্তঃ এঁকেই মনসামঙ্গলের 'আদিকবি' মনে করা হয়।•নারায়ণ দেবঃ পূর্ববঙ্গের জনপ্রিয় কবি, যাঁর কাব্য 'পদ্মপুরাণ' নামে পরিচিত।•বিজয়গুপ্তঃ বরিশালের কবি, যাঁর কাব্যটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সময়ে রচিত।•বিপ্রদাস পিপলাইঃ পশ্চিমবঙ্গের কবি, যাঁর কাব্যের নাম 'মনসা-বিজয়' (১৪৯৫ খ্রি.)।
•শ্রেষ্ঠ কবির কবি-কৃতিত্ব (বিজয়গুপ্ত)•
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মনসামঙ্গল কাব্যের ইতিহাসে প্রাক-চৈতন্য যুগের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিজয়গুপ্ত সর্বজনস্বীকৃত। ১৪৯৪-৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর 'পদ্মপুরাণ' কাব্যটি রচনা করেন। তাঁর কবিকৃতির যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলি দেখতে পাই সেগুলি হলো-
ক) চরিত্র চিত্রণ:
বিজয়গুপ্ত তাঁর কাব্যে চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষত বেহুলা চরিত্রটিকে তিনি আদর্শ সতীত্বের ঊর্ধ্বে এক অসামান্য তেজস্বিনী নারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। মৃত স্বামীকে বাঁচানোর জন্য তার দুর্গম যাত্রা ও দেবতাদের সামনে নৃত্য প্রদর্শন বাংলা সাহিত্যে বিরল।
খ) লৌকিকতা ও সমাজচিত্র:
তিনি তাঁর কাব্যে মধ্যযুগের বাংলার গ্রাম্য সমাজ, খাদ্যাভ্যাস, আচার-অনুষ্ঠান ও মানুষের অভাব-অনটনের বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। লৌকিক দেবীর মানবীসুলভ ঈর্ষা ও কোপ প্রকাশে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
গ) হাস্যরস ও করুণ রসের সার্থক প্রয়োগ:
মনসার সঙ্গে চণ্ডীর বিবাদ বা শিবের ভাঙড় রূপ বর্ণনায় কবি নিপুণ হাস্যরসের পরিচয় দিয়েছেন। আবার লখীন্দরের মৃত্যু ও বেহুলার বিলাপের বর্ণনায় করুণ রস পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। যেমন কবির ভাষায়:
"একই সর্পের বিষে লখী মরিল কেবল।
অভাগিনী বেহুলার নয়নে ঝরে জল।।"
>
ঘ) ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
বিজয়গুপ্তের কাব্যে তৎকালীন বাংলার সুলতানি শাসনের (হোসেন শাহ) উল্লেখ পাওয়া যায়, যা কাব্যটির ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা বৃদ্ধি করে।
উপসংহার
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, বিজয়গুপ্ত কেবল একজন সর্পদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দক্ষ জীবনশিল্পী। তাঁর কাব্যের প্রসাদগুণ এবং বর্ণনশৈলীর কারণেই তিনি প্রাক-চৈতন্য যুগের অন্যান্য কবিদের তুলনায় অনন্য উচ্চতায় আসীন।
আপনার কি এই উত্তরটি থেকে কোনো পয়েন্ট আরও বিস্তারিত জানার প্রয়োজন আছে? অথবা অন্য কোনো কবির (যেমন বিজয়গুপ্ত বা নারায়ণ দেব)
তুলনা আলাদা করে দেখতে চান?
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) সেমিস্টার পরীক্ষার মানদণ্ড অনুযায়ী বিজয়গুপ্তের কবিকৃতি নিয়ে একটি আদর্শ ১০ নম্বরের উত্তর নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো। এটি আপনি সরাসরি পরীক্ষার খাতায় ব্যবহারের উপযোগী করে পয়েন্ট আকারে সাজানো হয়েছে।
মনসামঙ্গল কাব্যের কবি বিজয়গুপ্তের কবিকৃতি
ভূমিকা
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা হলো মনসামঙ্গল। এই ধারার আদি কবিদের মধ্যে প্রাক-চৈতন্য যুগের বরিশাল নিবাসী বিজয়গুপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত। ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১৪৯৮) সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে তিনি তাঁর 'পদ্মপুরাণ' কাব্যটি রচনা করেন। তাঁর কাব্যে দেবীর মাহাত্ম্যের চেয়ে মানবজীবনের সুখ-দুঃখের চিত্রায়নই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
বিজয়গুপ্তের কবিকৃতির প্রধান দিকসমূহ
১. অনন্য চরিত্র চিত্রণ
বিজয়গুপ্তের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে তাঁর অঙ্কিত রক্ত-মাংসের জীবন্ত চরিত্রগুলোর মধ্যে।
* বেহুলা: বিজয়গুপ্তের বেহুলা কেবল একজন পতিব্রতা সতী নন, বরং এক তেজস্বিনী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নারী। বিধাতা ও নিয়তির বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই তাকে মহাকাব্যিক উচ্চতা দান করেছে।
* চাঁদ সদাগর: শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত চাঁদের দর্প ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মমর্যাদার এক করুণ কাহিনী কবি ফুটিয়ে তুলেছেন।
২. লৌকিকতা ও বাস্তব সমাজচিত্র
বিজয়গুপ্তের কাব্যে দেবতারাও মর্ত্যের মানুষের মতো আচরণ করেন। মনসার ঈর্ষা, ক্রোধ এবং শিবের প্রতি তাঁর আচরণে বাংলার গ্রাম্য গৃহবিবাদের ছায়া স্পষ্ট। এছাড়া সেকালের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, অলঙ্কার, বিবাহরীতি এবং কৃষিজীবী সমাজের দৈনন্দিন সংগ্রামের চিত্র তাঁর কাব্যে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. হাস্যরস ও করুণ রসের সার্থকতা
কবি হাস্যরস ও করুণ রস—উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ ছিলেন।
* হাস্যরস: শিবের ভাঙড় রূপ এবং বৃদ্ধ বয়সে শিবের চপলতা বর্ণনায় কবি কৌতুকবোধের পরিচয় দিয়েছেন।
* করুণ রস: লখীন্দরের মৃত্যু ও বেহুলার বিলাপ বর্ণনায় কবির লেখনী অত্যন্ত মর্মস্পর্শী।
> "একই সর্পের বিষে লখী মরিল কেবল।
> অভাগিনী বেহুলার নয়নে ঝরে জল।।"
>
৪. ভাষাশৈলী ও অলঙ্কার প্রয়োগ
বিজয়গুপ্তের ভাষা ছিল সাবলীল এবং লোকায়ত শব্দে সমৃদ্ধ। উপমা ও রূপকের ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। তাঁর কাব্যে লোকজ প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার বর্ণনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
৫. ঐতিহাসিক মূল্য
বিজয়গুপ্ত তাঁর কাব্যে তৎকালীন গৌড়েশ্বর সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের নাম উল্লেখ করেছেন:
> "সুলতান হোসেন শাহ নৃপতি তিলক।
> অন্তরে জানিয়া পাছে হৈল পুণ্যলোক।।"
> এটি কাব্যটির কালনির্ণয় এবং তৎকালীন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বুঝতে সাহায্য করে।
>
মূল্যায়ন
বিজয়গুপ্তের 'পদ্মপুরাণ' কাব্যটি কেবল ধর্মীয় মাহাত্ম্য প্রচারের দলিল নয়, এটি মধ্যযুগের বাংলার এক অমূল্য সামাজিক ও সাহিত্যিক সম্পদ। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাস্তবমুখী বর্ণনার কারণেই তিনি প্রাক-চৈতন্য যুগের মনসামঙ্গল ধারার মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে পরিগণিত হন।
পরীক্ষার জন্য বিশেষ টিপস:
* উত্তরটি লেখার সময় বিজয়গুপ্তের কাব্যের নাম 'পদ্মপুরাণ' এবং রচনাকাল ১৪৯৪-৯৫ খ্রি. স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন।
* উদ্ধৃতিগুলো (যেমন হোসেন শাহের উল্লেখ বা বেহুলার বিলাপ) নীল কালিতে লিখলে পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হয়।
আপনার কি এই উত্তরের কোনো অংশ ছোট করতে হবে বা অন্য
কোনো কবির সাথে তুলনা প্রয়োজন?
Comments
Post a Comment