ইসলামিক শিক্ষায় ধর্মীয় ও জাগতিক বিদ্যার সমন্বয় ঘটেছে-আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাস
মধ্যযুগীয় ভারতের শিক্ষা ধারায় ধর্মীয় বিদ্যা (Manqulat) ও জাগতিক বা ইহলৌকিক বিদ্যার (Maqulat) সমন্বয় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। যেখানে মধ্যযুগীয় ভারতে ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল ধর্মতত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সুলতানি এবং বিশেষ করে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় আদর্শের পাশাপাশি বাস্তববাদী ও জাগতিক বিষয়গুলির এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছিল।
১. পাঠ্যক্রমের বিভাজন: 'মাকুলাত' ও 'মানকুলাত'
ইসলামিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল:
* মানকুলাত (ধর্মীয় বিদ্যা): এতে কুরআন শরিফ পাঠ, হাদিস, ইসলামি আইন (শারিয়ত) এবং সুফিবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর লক্ষ্য ছিল আধ্যাত্মিক মুক্তি।
* মাকুলাত (জাগতিক বিদ্যা): এতে যুক্তিশাস্ত্র, দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর লক্ষ্য ছিল জাগতিক উন্নতি ও প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন।
২. প্রাথমিক স্তরে সমন্বয় (মক্তব)
মক্তবগুলিতে শিশুদের কেবল কুরআন পাঠ শেখানো হতো না, বরং এর পাশাপাশি বর্ণপরিচয়, লিখন দক্ষতা এবং সাধারণ পাটিগণিত শেখানো হতো। ফারসি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের রাজকার্যের উপযোগী করে তোলা হতো।
৩. উচ্চশিক্ষার স্তরে সমন্বয় (মাদ্রাসা)
মাদ্রাসাগুলি ছিল উচ্চতর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এখানে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি নিম্নলিখিত জাগতিক বিষয়গুলি গুরুত্ব পেত:
* গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা: পঞ্জিকা তৈরি এবং কর আদায়ের হিসাব রাখার জন্য গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা শেখানো হতো।
* ইতিহাস ও রাজনীতি: রাজপ্রাসাদের আদব-কায়দা এবং শাসনের ইতিহাস আবশ্যিক পাঠ্য ছিল।
* চিকিৎসা বিজ্ঞান (ইউনানি): শরীরবিদ্যা ও ভেষজ বিজ্ঞানের চর্চা মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
৪. সম্রাট আকবরের সংস্কার
জাগতিক বিদ্যার প্রসারে সম্রাট আকবরের ভূমিকা ছিল বৈপ্লবিক। তিনি পাঠ্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন এবং নৈতিকতা (Akhlaq), কৃষিবিদ্যা, জ্যামিতি, শরীরতত্ত্ব (Physiology) এবং জনশাসন (Public Administration) বিষয়গুলিকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর মতে, শিক্ষা হওয়া উচিত জীবনমুখী এবং বাস্তববাদী।
৫. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা
ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং হস্তশিল্প, অলঙ্কার নির্মাণ, স্থাপত্যকলা এবং সমরবিদ্যাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো। এর ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন ধার্মিক হয়ে উঠত, অন্যদিকে তারা দক্ষ কারিগর বা যোদ্ধা হিসেবেও গড়ে উঠত।
৬. সহাবস্থান ও উপাধি প্রদান
মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মেধা অনুযায়ী উপাধি দেওয়া হতো:
* ফাজিল: যারা যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে পারদর্শী ছিলেন।
* আলিম: যারা ধর্মীয় তত্ত্বে দক্ষ ছিলেন।
* কাবিল: যারা সাহিত্যে পারদর্শী ছিলেন।
এই উপাধি প্রদান ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় প্রকার জ্ঞানকেই সমান মর্যাদা দেওয়া হতো।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগীয় ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। সেখানে একদিকে যেমন পারলৌকিক কল্যাণের জন্য ধর্মের পাঠ দেওয়া হতো, অন্যদিকে সুন্দরভাবে জীবনযাপনের জন্য এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য জাগতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো। এই সমন্বিত প্রয়াসই ভারতকে মধ্যযুগে সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছিল।
পরবর্তী পদক্ষেপ:
এই উত্তরের কোনো বিশেষ অংশ যেমন 'সম্রাট আকবরের শিক্ষা সংস্কার' সম্পর্কে কি আপনি আলাদাভাবে বিস্তারিত জানতে চান? নাকি পরবর্তী কোনো টপিক (যেমন: উচ্চশিক্ষায় না
রী শিক্ষা) নিয়ে আলোচনা করব?
পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাসে ভারতের শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনায় 'নারী শিক্ষা' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অবস্থান ও বিবর্তনকে প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক—এই তিন যুগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে। ১০ নম্বরের উপযোগী একটি নোট নিচে দেওয়া হলো:
ভারতে উচ্চশিক্ষায় নারী: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাস
ভারতীয় সমাজে যুগে যুগে নারী শিক্ষার রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। কখনও নারীরা উচ্চশিক্ষার শিখরে পৌঁছেছেন, আবার কখনও সামাজিক প্রথার বেড়াজালে তাঁদের শিক্ষা অবরুদ্ধ হয়েছে।
১. প্রাচীন যুগ (বৈদিক ও উত্তর-বৈদিক কাল)
প্রাচীন ভারতে নারীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক।
* ঋগ্বৈদিক যুগ: এই যুগে নারীরা 'উপনয়ন' সংস্কারের অধিকারিণী ছিলেন। উচ্চশিক্ষিতা নারীদের দুই ভাগে ভাগ করা হতো— 'ব্রহ্মবাদিনী' (যারা সারাজীবন দর্শন ও বেদ চর্চা করতেন) এবং 'সদ্যোবধু' (যারা বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন)।
* বিখ্যাত বিদুষী নারী: লোপামুদ্রা, ঘোষা, অপালা, গার্গী এবং মৈত্রেয়ী ছিলেন উচ্চশিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গার্গী ও মৈত্রেয়ী রাজসভায় দার্শনিক তর্কে পণ্ডিতদের পরাজিত করতেন।
২. মধ্যযুগ (ইসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থা)
মধ্যযুগে 'পর্দা প্রথা' ও বাল্যবিবাহের কারণে সাধারণ নারীদের উচ্চশিক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
* গৃহশিক্ষা: উচ্চবিত্ত ও রাজপরিবারের নারীরা গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফারসি এবং শিল্পকলা শিখতেন।
* উল্লেখযোগ্য নারী: সুলতান ইলতুৎমিসের কন্যা রাজিয়া সুলতানা, বাবর-কন্যা গুলবদন বেগম (যিনি 'হুমায়ুননামা' লিখেছিলেন) এবং ঔরঙ্গজেব-কন্যা জেবুন্নিসা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও বিদুষী। তাঁরা নিজস্ব পাঠাগার ও মাদ্রাসাও পরিচালনা করতেন।
৩. ব্রিটিশ আমল ও আধুনিক যুগ
উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে নারী উচ্চশিক্ষায় জোয়ার আসে।
* উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): এই দলিলে নারী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি অনুদানের কথা বলা হয়।
* বেথুন স্কুল ও কলেজ: জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের প্রচেষ্টায় ১৮৪৯ সালে বেথুন স্কুল (পরবর্তীতে কলেজ) স্থাপিত হয়, যা নারী উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করে।
* প্রথম স্নাতক: ১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং চন্দ্রমুখী বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম মহিলা স্নাতক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
৪. স্বাধীনোত্তর ভারত ও বর্তমান পরিস্থিতি
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন কমিশন উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম করেছে।
* রাধাকৃষ্ণন কমিশন (১৯৪৮-৪৯): এই কমিশন নারীদের জন্য গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাধারণ উচ্চশিক্ষার সুপারিশ করে।
* কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬): নারী-পুরুষের শিক্ষার সমানাধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
* বর্তমান প্রেক্ষাপট: বর্তমানে STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নারীরা উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছেন। NEP 2020-এ 'Gender Inclusion Fund' গঠনের মাধ্যমে নারী উচ্চশিক্ষাকে আরও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় নারী অগ্রগতির পথে অন্তরায়সমূহ
এত উন্নতি সত্ত্বেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে:
১. সামাজিক রক্ষণশীলতা: গ্রামীণ এলাকায় এখনও উচ্চশিক্ষার চেয়ে বিবাহকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
২. নিরাপত্তাহীনতা: উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব ও নিরাপত্তা অনেক সময় বাধার সৃষ্টি করে।
৩. অর্থনৈতিক কারণ: দরিদ্র পরিবারে ছেলের শিক্ষাকে মেয়ের উচ্চশিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপসংহার
নারীর উচ্চশিক্ষা কেবল একটি ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি একটি জাতির উন্নয়নের চাবিকাঠি। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়— "পাখি যেমন এক ডানা দিয়ে উড়তে পারে না, নারীশক্তি জাগ্রত না হলে সমাজও তেমনি এগোতে পারে না।"
পরবর্তী পদক্ষেপ:
আপনি কি এই টপিক থেকে ছোট প্রশ্ন (২ নম্বরের) কিছু সাজেশন চান? নাকি 'উডের ডেসপ্যাচ' বা 'সার্জেন্ট পরিকল্পনা' সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব?
Comments
Post a Comment