Skip to main content

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসে 'বসন' এবং 'ঠাকুরঝি'—এই দুই নারী চরিত্র বীরভূমের লৌকিক পটভূমিতে দুটি ভিন্ন মেরুর প্রতিনিধি। একজন বসন্তের ঝোড়ো হাওয়ার মতো উত্তাল, অন্যজন শ্রাবণের ধারার মতো শান্ত ও স্নিগ্ধ। নিচে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ট্র্যাজেডির তুলনামূলক আলোচনা করো।

 তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসে 'বসন' এবং 'ঠাকুরঝি'—এই দুই নারী চরিত্র বীরভূমের লৌকিক পটভূমিতে দুটি ভিন্ন মেরুর প্রতিনিধি। একজন বসন্তের ঝোড়ো হাওয়ার মতো উত্তাল, অন্যজন শ্রাবণের ধারার মতো শান্ত ও স্নিগ্ধ। নিচে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ট্র্যাজেডির তুলনামূলক আলোচনা করো।

          আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বসন চরিত্রটি কবি উপন্যাসের একটি বিশিষ্ট নারী চরিত্র, যে বীরভূমের সেই ভ্রাম্যমাণ 'ঝুমুর' দলের প্রতিনিধি, যাদের জীবন মানেই হলো গান, নাচ আর অনিশ্চয়তা।তবে-তার জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও দহন পাঠক মহলের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আসলে বসন চরিত্রের ধরনটি হলো-

       বসন চঞ্চল, স্পষ্টভাষী এবং কিছুটা উদ্ধত। তার জীবনে দারিদ্র্য আর লাঞ্ছনা নিত্যসঙ্গী, তাই তার উপরিভাগে এক ধরনের কঠোরতা দেখা যায়।কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক তৃষ্ণার্ত হৃদয়।যেখানে নিতাইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল তীব্র ও জাগতিক।সে নিতাইয়ের কবিত্বকে ভালোবেসেছিল এবং তার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিল এক টুকরো আশ্রয়ের ভালোবাসা। তবুও আমরা দেখি-

         বসনের ট্র্যাজেডি অত্যন্ত নিষ্ঠুর।বসন্ত রোগের প্রকোপে তার রূপ ও জীবন-দুই-ই বিলীন হয়ে যায়। মৃত্যুর আগে তার সেই আর্তনাদ-"জীবন এত ছোট কেনে?"- আর এই কথাটিই উপন্যাসের মূল সুর হয়ে দাঁড়ায়।আসলে সে চেয়েছিল বাঁচতে, চেয়েছিল নিতাইয়ের পাশে থাকতে, কিন্তু সমাজ আর নিয়তি তাকে সেই সুযোগ দেয়নি।আবার এই বসনের পাশাপাশি আমরা-

       ঠাকুরঝি চরিত্রটি। সে নিতান্তই শান্ত, সুগভীর প্রেম ও বিচ্ছেদ তার জীবনের সাথী। আসলে এই ঠাকুরঝি চরিত্রটি বীরভূমের এক শান্ত ও শ্রীময়ী গ্রাম্য বধূর রূপক।সে যেন ওই রাঙামাটির ভেতরের শীতল ফল্গুধারা।আর সেখানে চরিত্রের ধরনটি হলো-

     ঠাকুরঝি মৌন, স্বল্পভাষী এবং অত্যন্ত ধৈর্যশীল। সে তার সংসারের গণ্ডিতে থেকেও নিতাইয়ের গানের প্রেরণা হয়ে উঠেছিল। তার কালো চোখের দৃষ্টি নিতাইয়ের মনে কাব্যের জোয়ার আনত।তার মধ্যে দেখা যায় চিরন্তন প্রেমের স্বরূপ। আর সেখানে ঠাকুরঝির প্রেম ছিল আধ্যাত্মিক ও অর্ঘ্যদানের মতো। সে নিতাইয়ের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা করেনি, বরং নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে তার গানের উপজীব্য হিসেবে।

        • ঠাকুরঝির ট্র্যাজেডি হলো 'বিরহ'। সে সারাজীবন লৌকিক সংসারের ঘেরাটোপে থেকেও অলৌকিক এক প্রেমে দগ্ধ হয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে সে তার প্রেমকে প্রকাশ করতে পারেনি, কিন্তু অন্তরের গহীনে সেই দহন বয়ে বেড়িয়েছে। নিতাই যখন চলে যায়, তখন ঠাকুরঝির সেই নীরব চোখের জলই তার জীবনের বড় ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে।মোটকথা হলো-

       বসনের বিশেষত্ব হলো বসন ঝুমুরওয়ালী। সে আগুনের মতো দাহ্য ও চঞ্চল।নিতাইয়ের জীবনে সে অনবদ্য ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়।শুধু তাই নয়,নিতাইয়ের শিল্পীসত্তার জাগতিক আশ্রয় হলো বসন।আসলে এই বসন কামনাময় ও অধিকারবোধসম্পন্ন একটি নারী চরিত্র। আর সে কারণেই তার জীবনে পরিণতিতে নেমে আসে চরম ট্র্যাজেডি। আর তার ফলেই হয়ত অকাল মৃত্যু নেমে আসে তার জীবনে।(বসন্ত রোগে)।কিন্তু -

       ঠাকুরঝি গ্রাম্য বধূ।মাটির মতো সহনশীল ও শান্ত প্রকৃতির নারী চরিত্র।যে নিতাইয়ের কবিত্বের আদি উৎস ও প্রেরণা।শুধু তাই নয়, তার প্রেমের ধরণ নিষ্কাম, নীরব ও অর্পণমূলক। আর এই নীরবতাই সারাজীবনের বিরহ ও অতৃপ্তির বাসনা তার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রাখে।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বসন ও ঠাকুরঝি-এই দুই নারীর মাধ্যমেই কবি নিতাইয়ের জীবন পূর্ণতা পেয়েছে। একজনের কাছে সে পেয়েছে শরীরী জীবনের স্বাদ ও বাস্তবের রুক্ষতা, আর অন্যজনের কাছে পেয়েছে অলৌকিক রসের প্রেরণা। বসন যেখানে বীরভূমের 'ঝুমুর' সংস্কৃতির অন্ধকার দিকটি তুলে ধরে, ঠাকুরঝি সেখানে বাংলার চিরায়ত মরমী প্রেমের প্রতীক হয়ে থাকে। এই দুই নারীর ট্র্যাজেডিই আসলে 'কবি' উপন্যাসকে একটি সার্থক ট্র্যাজিক মহিমায় উন্নীত করেছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir.

Comments