বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য সংস্কৃতির অবদান আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,বাঙালি জাতির ইতিহাস ও সাহিত্যের ধারায় শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) এক বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্ব।আসলে ষোড়শ শতাব্দীতে তাঁর আবির্ভাব কেবল ধর্মীয় আন্দোলন নয়, বরং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক নবজাগরণের সূচনা করেছিল।চৈতন্য সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগের সংকীর্ণতা কাটিয়ে এক বিশাল মানবিক ও নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করে। ড. সুকুমার সেনের মতে-
"চৈতন্যদেবই প্রথম বাঙালি, যিনি সারা ভারতে বাঙালি সংস্কৃতি ও প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।"
• জীবনী সাহিত্য বা চরিত-সাহিত্যের উদ্ভবের দৃষ্টিতে বলা যায়-চৈতন্য সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো চরিত-সাহিত্য। শ্রীচৈতন্যের মহাজীবনের আদর্শকে ধরে রাখার জন্য তাঁর সমকালীন ও পরবর্তী ভক্তরা একের পর এক জীবনী গ্রন্থ রচনা করেন।এর আগে বাংলা সাহিত্যে দেবদেবীর বন্দনা থাকলেও কোনো রক্ত-মাংসের মানুষকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির প্রবণতা ছিল না। মুরারি গুপ্তের 'কড়চা', বৃন্দাবন দাসের 'চৈতন্যভাগবত', কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'চৈতন্যচরিতামৃত', লোচন দাসের 'চৈতন্যমঙ্গল' প্রভৃতি গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। বিশেষত কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'চৈতন্যচরিতামৃত' কেবল একটি জীবনী গ্রন্থ নয়, এটি দর্শন, ভক্তিতত্ত্ব এবং কাব্যমাধুর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। আর সেখানে সেই পথ ধরে আসে-
•পদাবলি সাহিত্যের বিবর্তন ও সমৃদ্ধি।চৈতন্য-পূর্ববর্তী বৈষ্ণব পদাবলি (বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস) প্রধানত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু চৈতন্য-উত্তর যুগে এই সাহিত্যে 'গৌরচন্দ্রিকা' নামক এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। রাধা-কৃষ্ণের লীলা বর্ণনার আগে চৈতন্যদেবের রূপ ও মহিমা বর্ণনা করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। পদকর্তারা চৈতন্যদেবকে 'রাধা-ভাবদ্যুতি সুবলিত' কৃষ্ণ হিসেবে কল্পনা করেন। বাসুদেব ঘোষ, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস ও বলরাম দাসের পদাবলিতে চৈতন্যের প্রেমধর্ম এক নতুন মানবিক মাত্রা পায়। চৈতন্য সংস্কৃতির প্রভাবে পদের ভাষা যেমন মার্জিত হয়েছে, তেমনি ভাবের গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।আর সেই ভাবের গভীরতা থেকেই-
মানবিকতার জাগরণ ঘটে।চৈতন্য সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অবদান হলো সাহিত্যে চণ্ডালের উচ্চ আসন দান। "চণ্ডালোঽপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তিপরায়ণঃ"-এই আদর্শকে সাহিত্যে ঠাঁই দিয়ে তিনি জাতিভেদ প্রথার মূলে আঘাত করেন। এর ফলে বাংলা সাহিত্যে নিম্নবর্গের মানুষেরা ব্রাত্য থাকল না। জয়ানন্দ বা বৃন্দাবন দাসের বর্ণনায় সমকালীন সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র ও সামাজিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। সাহিত্য কেবল অভিজাত বা দেবকুলের কুক্ষিগত না থেকে গণমুখী হয়ে ওঠে।
**৪. ভাষা ও ছন্দশৈলীর বিকাশ:**
চৈতন্য সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়োজনেই বাংলা ভাষা এক দৃঢ় ও সুসংবদ্ধ রূপ পায়।যার ফলে বাংলা ভাষা ও ছন্দশৈলীর বিকাশ ঘটে।বিশেষ করে 'চৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থে জটিল দার্শনিক তত্ত্বকে যেভাবে সহজ-সরল ও অর্থবহ বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে, তা তৎকালীন গদ্যধর্মী পদ্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এছাড়া কীর্তনের সুরে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের ব্যবহার বাংলা কাব্যসংগীতের এক স্থায়ী ভিত তৈরি করে দেয়। ব্রজবুলি ভাষার চর্চাও এই সময়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।
চৈতন্য জীবনী কাব্যগুলো তৎকালীন বাংলার সমাজ ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল।আর সেখানে হোসেন শাহের শাসনকাল, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, সামাজিক কুসংস্কার এবং নবদ্বীপের বিদগ্ধ পণ্ডিত সমাজের বিবরণ এই কাব্যগুলোতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধরা পড়েছে। চৈতন্য সংস্কৃতির ফলেই বাঙালি প্রথম আত্মপরিচয় ও ইতিহাস সচেতনতা লাভ করে।শুধু তাই নয়-
চৈতন্য প্রবর্তিত ‘নাম সংকীর্তন’ বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল লোক সংস্কৃতির প্রভাবের কারণেই।আর এই সংকীর্তনের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ সাহিত্যের আস্বাদন পেত। বাউল, মারফতি এবং পরবর্তীকালে রামপ্রসাদী গানেও পরোক্ষভাবে চৈতন্য-প্রভাবিত উদারতা ও আধ্যাত্মিক আর্তি লক্ষ্য করা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য সংস্কৃতি এক স্বর্ণযুগের জন্ম দিয়েছিল। তিনি নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা না করলেও, তাঁকে কেন্দ্র করে যে বিশাল সাহিত্যসম্ভার গড়ে উঠেছে, তা ছাড়া বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়, "চৈতন্যের প্রেমোচ্ছ্বাস সমস্ত বাংলাদেশে পরিব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছিল এবং সেই প্লাবন হইতেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম উদ্ভব এবং পুষ্টি হইয়াছে।" চৈতন্য সংস্কৃতি কেবল বৈষ্ণব ধর্ম নয়, বরং বাঙালির জাতিসত্তা ও সৃজনশীলতার মূল উৎস।
Comments
Post a Comment