Skip to main content

বৌদ্ধ দর্শনে চারটি আর্যসত্য(4th.Sem.) ব্যাখ্যা করো।

বৌদ্ধ দর্শনে চারটি আর্যসত্য ব্যাখ্যা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার দর্শন মাইনর)

         •আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো চার আর্যসত্য।আর এই চারটি সত্য গৌতম বুদ্ধের প্রথম ধর্মোপদেশ, "ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্র"-এর নির্যাস।আসলে গৌতম বুদ্ধ জ্ঞানলাভের পর এই আর্যসত্যগুলি প্রকাশ করেন।যে আর্যসত্য মানবজাতির দুঃখ এবং তা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে সাহায্য করে। গৌতম বুদ্ধের সেই চারটি আর্য সত্য হলো-

১) দুঃখ আর্যসত্যঃ গৌতম বুদ্ধের প্রথম আর্যসত্য হলো দুঃখের সত্যতা। বুদ্ধ বলেছেন যে জীবন মাত্রই দুঃখময়। এখানে দুঃখ বলতে শুধু শারীরিক কষ্ট বা মানসিক যন্ত্রণা বোঝানো হয়নি, বরং জীবনের অপরিহার্য পরিবর্তনশীলতা, অপূর্ণতা এবং অতৃপ্তিকেও বোঝানো হয়েছে। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু - এ সবই দুঃখ। প্রিয়জনের বিচ্ছেদ, অপ্রিয়জনের সঙ্গে বাস, যা চাওয়া হয় তা না পাওয়া, বা যা আছে তা ধরে রাখতে না পারার অক্ষমতা - এ সবই দুঃখের প্রকারভেদ।আসলে-

          •গৌতম বুদ্ধের মতে, আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি দিকই দুঃখের সঙ্গে জড়িত, কারণ সবকিছুই অনিত্য এবং অনাত্ম। স্থায়ী সুখ বলে কিছু নেই। এ বাস্তবিক জীবনে যা সুখ বলে মনে হয়, তাও পরিবর্তনশীল এবং শেষ পর্যন্ত তা দুঃখেই পর্যবসিত হয়।

২)দুঃখসমুদয় আর্যসত্যঃ গৌতম বুদ্ধের দ্বিতীয় আর্যসত্য হলো দুঃখের কারণ।আর সেখানে বুদ্ধ দেখিয়েছেন যে, দুঃখের মূল কারণ হলো তৃষ্ণা। আর তৃষ্ণা মানে আকাঙ্ক্ষা, লালসা, কামনা বা আসক্তি। তবে এই তৃষ্ণা তিন প্রকার। আর সেই প্রকার গুলি হল-                                                      ক) ক)কাম তৃষ্ণাঃ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের (রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ) প্রতি আকাঙ্ক্ষা।

খ)ভব-তৃষ্ণাঃ অস্তিত্বের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ অমরত্বের কামনা বা কোনো কিছু চিরকাল ধরে রাখার ইচ্ছা।

 গ)বিভব-তৃষ্ণাঃ অনস্তিত্বের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ কোনো কিছু থেকে মুক্তি বা বিনাশের ইচ্ছা (যেমন দুঃখ থেকে চিরতরে মুক্তি)।

          •এই তৃষ্ণাই আমাদের পুনর্জন্মের চক্রে (সংসার) আবদ্ধ করে রাখে। আমাদের জীবনে আকাঙ্ক্ষা যখন পূরণ হয় না, তখন হতাশা, ক্রোধ ও দুঃখের জন্ম হয়। এমনকি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলেও তা ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়।যা আবার অতৃপ্তি ও দুঃখ নিয়ে আসে। তবে তৃষ্ণার মূলে রয়েছে অবিদ্যা বা অজ্ঞানত।

৩)দুঃখনিরোধ আর্যসত্যঃ গৌতম বুদ্ধের তৃতীয় আর্যসত্য হলো দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তি। যেহেতু দুঃখের কারণ তৃষ্ণা, তাই তৃষ্ণার সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটাতে পারলেই দুঃখের অবসান হবে। এই অবস্থাকেই নির্বাণ বলা হয়। নির্বাণ মানে সকল প্রকার তৃষ্ণা, আসক্তি এবং দুঃখের সম্পূর্ণ নিবৃত্তি। এটি কোনো অলৌকিক স্বর্গ নয়, বরং একটি মানসিক অবস্থা যেখানে লোভ, দ্বেষ এবং মোহ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়। আর মোহ বিলুপ্ত হলেই-

            •নির্বাণ লাভ করলে ব্যক্তি পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে এবং পরম শান্তি ও মুক্তি অনুভব করে। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মানসিক ক্লেশ এবং অবিদ্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়, এবং জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ হয়।

৪)দুঃখনিরোধগামিনী আর্যসত্যঃ চতুর্থ আর্যসত্য হলো দুঃখ নিরোধের পথ। বুদ্ধ এই পথকে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলেছেন। এটি আটটি সঠিক অনুশীলনের সমষ্টি, যা নির্বাণ লাভের দিকে পরিচালিত করে। এই পথটি মধ্যপন্থা নামেও পরিচিত। কারণ এটি অতিরিক্ত ভোগবাদ এবং কঠোর তপস্যার চরম পন্থাকে পরিহার করে। শুধু তাই নয়,এ জীবনে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে হলে তিনি যে আটটি পথের দিশা দিয়েছেন তা ভারতীয় দর্শনে সেটি অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত। আর সেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ গুলি হলো-

  • সম্যক দৃষ্টি: চারটি আর্য সত্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান।
  • সম্যক সংকল্প: অহিংসা, প্রেম এবং ত্যাগের দৃঢ় সংকল্প।
  • সম্যক বাক্য: মিথ্যা, কঠোর বা অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার করে সত্য ও প্রীতিপূর্ণ কথা বলা।
  • সম্যক কর্মান্ত: সৎ ও নৈতিক কর্ম সম্পাদন করা, যেমন - হত্যা, চুরি, ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা।
  • সম্যক আজীব: সৎ ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা।
  • সম্যক ব্যায়াম: সৎ চিন্তা ও কর্মের অনুশীলন করা এবং অসৎ চিন্তা ও কর্ম পরিহার করা।
  • সম্যক স্মৃতি: মনকে বর্তমান মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত করে আত্ম-সচেতন থাকা।
  • সম্যক সমাধি: ধ্যানের মাধ্যমে মনকে একাগ্র ও শান্ত করা।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...