বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস)।
উনিশ শতকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাকে সুসংবদ্ধ করার লক্ষে ১৮৯৩ সালে 'বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অব লিটারেচার' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৮৯৪ সালে 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' নামে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও এই প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর (১৮৯১) সামান্য পরে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল, তবুও এর পরিকল্পনা, আদর্শ এবং প্রেক্ষাপট তৈরিতে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।আর সেখানে বিদ্যাসাগরের অবদান ও প্রভাব হলো-
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলা গদ্যের শ্রীবৃদ্ধি এবং দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ। বিদ্যাসাগর তাঁর সারাজীবনের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, পরিষদ সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অনেকেই ছিলেন বিদ্যাসাগরের গুণমুগ্ধ অনুরাগী।
পরিষদ গঠনের আগে বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় যতিচিহ্ন ও বিরামচিহ্নের সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে ভাষাকে একটি বিজ্ঞানসম্মত রূপ দিয়েছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ যখন বাংলা বানানের নিয়ম বা ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ শুরু করে, তখন বিদ্যাসাগরের প্রবর্তিত গদ্যরীতিই ছিল তাদের প্রধান পথপ্রদর্শক।
বিদ্যাসাগর ব্যক্তিগতভাবে বহু প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁর এই গবেষণাধর্মী মানসিকতা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উত্তরসূরিদের (যেমন— হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) অনুপ্রাণিত করেছিল বাংলার লুপ্তপ্রায় সাহিত্য সম্পদ উদ্ধার করতে।
বিদ্যাসাগরের বাদুড়বাগানের বাড়িতে যে সারস্বত আড্ডা বা মনীষীদের সমাগম হতো, সেখানেই মূলত বাংলা সাহিত্যের একটি স্থায়ী অ্যাকাডেমি গড়ার প্রাথমিক ভাবনাগুলো দানা বেঁধেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে পরিষদের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিদ্যাসাগরের আদর্শকেই প্রতিষ্ঠানের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায় যায় যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সরাসরি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় উপস্থিত না থাকলেও, তাঁর সাহিত্যিক আদর্শ এবং বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর ত্যাগই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক থেকে শুরু করে পরবর্তী কর্ণধাররা বিদ্যাসাগরের প্রদর্শিত পথেই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
Comments
Post a Comment