Skip to main content

শিবায়ন কাব্যকে শিবমঙ্গল আখ্যা দেওয়া কত দূর সঙ্গত আলোচনা করো। প্রসঙ্গত এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবি রামেশ্বর ভট্টাচাৰ্যের কাব্যকৃতির পরিচয় দাও।

শিবায়ন কাব্যকে শিবমঙ্গল আখ্যা দেওয়া কত দূর সঙ্গত আলোচনা করো। প্রসঙ্গত এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবি রামেশ্বর ভট্টাচাৰ্যের কাব্যকৃতির পরিচয় দাও। (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা প্রথম সেমিস্টার মেজর DS1)।

          আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্য একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল বা ধর্মমঙ্গল কাব্যগুলির মতো শিবকে নিয়ে রচিত কাব্যধারাটি 'শিবায়ন' নামে পরিচিত। তবে অনেক কবি ও সমালোচক একে 'শিবমঙ্গল' নামে অভিহিত করেছেন। এই নামকরণের সার্থকতা এবং এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কৃতিত্ব নিচে আলোচনার পূর্বে শিবায়ন বনাম শিবমঙ্গল নামকরণের যৌক্তিকতা বিচার করা আবশ্যক। আর সেই বিচারে আমরা দেখি-মঙ্গলকাব্যের প্রচলিত সংজ্ঞার নিরিখে শিবায়নকে 'শিবমঙ্গল' বলা যায় কিনা, তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে-

        মঙ্গলকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো-দেব বন্দনা, আত্মপরিচয়, দেবীর মর্ত্যে পূজা প্রচার এবং শেষে ফলশ্রুতি। শিবায়ন কাব্যেও এই কাঠামোটি বর্তমান। বিশেষ করে গ্রন্থপাঠের ফলে জাগতিক মঙ্গলের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা একে মঙ্গলকাব্য ধারার অন্তর্ভুক্ত করে।এছাড়াও-

          মনসা বা চণ্ডী যেভাবে মর্ত্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ভক্তকে অনুগ্রহ ও অভক্তকে নিগ্রহ করেন, শিবের ক্ষেত্রে তেমন উগ্রতা দেখা যায় না। শিব এখানে শান্ত, দয়ালু এবং বাঙালির ঘরের লোক। এই চারিত্রিক পার্থক্যের কারণে অনেকে একে 'মঙ্গলকাব্য' না বলে 'আয়নী' বা শিবের কাহিনী (শিবায়ন) বলতে পছন্দ করেন। তা সত্ত্বেও মধ্যযুগের সমাজব্যাবস্থায় শিবের মহিমা গেয়ে অকল্যাণ দূর করার প্রথা ছিল। কবিরা কাব্য শেষে লিখেছেন-

      "এই শিবমঙ্গল যেবা করে শ্রবণ / সকল আপদ তার হয় বিমোচন।" 

       সুতরাং কাব্যগত কাঠামোর মিল থাকায় একে 'শিবমঙ্গল' আখ্যা দেওয়া মোটেও অসংগত নয়।

 •কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কাব্যকৃতি•

       শিবায়ন কাব্যধারার শ্রেষ্ঠ কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য নাম। তাঁর কবিকৃতিত্বের প্রধান ভূমিকা হলো-তিনি দেবলোক ও মর্ত্যলোকের মধ্যে এক নিবিড় সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। তাঁর লেখনীতে পৌরাণিক মহাদেব কৈলাসের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে মেদিনীপুরের এক অতি সাধারণ, দারিদ্র্যক্লিষ্ট কৃষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।তাঁর রচিত 'শিবসংকীর্তন' (১৭১০ খ্রিষ্টাব্দ) এই ধারার এক অমূল্য সম্পদ।আর এই কাব্য ধারায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলি হলো-

      রামেশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব হলো শিবকে বাঙালির ঘরের আপনজন করে তোলা। তাঁর কাব্যে শিব কেবল ত্রিলোকের নাথ নন, বরং তিনি অন্নকষ্টে জর্জরিত এক গৃহস্থ। অভাবের তাড়নায় যখন শিব চাষবাস করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার চিরন্তন কৃষক সমাজের প্রতিনিধি। তাঁর শিব লোকায়ত বাঙালির মতোই জরাজীর্ণ বস্ত্র পরিধান করেন এবং অভাবের সংসারে স্ত্রীর গঞ্জনা সহ্য করেন।যেখানে-

        রামেশ্বর শিবকে হিমালয়ের শিখর থেকে নামিয়ে এনে মেদিনীপুরের এক অভাবী কৃষকের রূপ দিয়েছেন। তাঁর শিব কেবল দেবতা নন, তিনি অন্নকষ্টে জর্জরিত এক গৃহস্থ। গৌরী এখানে ঝগড়াটে কিন্তু মমতাময়ী এক বাঙালি বধূ।শুধু তাই নয়,কৃষিকাজের বর্ণনায়  বাংলার বাস্তব ছবি উঠে এসে এ কবির কাব্যে। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-

       রামেশ্বরের কাব্যে শিবের কৃষিকাজের বিবরণ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দলিল। দরিদ্র শিব যখন চাষ করতে নামেন, তখন তাঁর সেই রূপটি কবির ভাষায় অনবদ্য ছন্দময় হয়ে উঠে-

"ভস্ম বিভূতি অঙ্গে বলদ বাহন।

চাষ কর শূলপাণি করিয়া যতন।।"

     শিবের এই চাষের আয়োজনের মধ্য দিয়ে মূলত তৎকালীন বাংলার সাধারণ কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি ও দারিদ্র্যের চিত্রই ফুটে উঠেছে।এর পাশাপাশি রামেশ্বর ভট্টাচাৰ্যের শিবসঙ্গীত কাব্যে দেখতে পাই-

   •হাস্যরস ও করুণ রসের প্রয়োগে অনবদ্য শিল্পশৈলী রামেশ্বর ভট্টাচার্যের শিব সংগীত কাব্যে দেখতে পাই।যেখানে নারদ যখন শিব ও গৌরীর মধ্যে কন্দল লাগিয়ে দেন, তখন সেখানে কৌতুকরসের সৃষ্টি হয়। আবার যখন অন্নহীন ঘরে সন্তানদের মুখে খাবার দিতে না পেরে শিব আক্ষেপ করেন, তখন সেখানে করুণ রস দানা বাঁধে। শাঁখা পরাকে কেন্দ্র করে শিব ও পার্বতীর মান-অভিমান এক চিরন্তন বাঙালি দাম্পত্যের ছবি ফুটিয়ে তোলে।

ঘ) সমাজ সচেতনতা ও ভাষা শৈলী:

রামেশ্বর কেবল একজন ভক্ত কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ পর্যবেক্ষক। মেদিনীপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন এবং অতি সাধারণ ভাষার ব্যবহারে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন— "দরিদ্রের শিব সম বন্ধু আর নাই।" এই একটি বাক্যে তিনি শিবকে আপামর দরিদ্র মানুষের পরমাত্মীয় করে তুলেছেন।

মূল্যায়ন ও উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, শিবায়ন কাব্যের মেজাজ অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের মতো সংঘাতময় নয়, বরং তা অনেক বেশি ঘরোয়া ও শান্ত। রামেশ্বর ভট্টাচার্য পৌরাণিক শিবকে যেভাবে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তাঁর কাব্যে শিবের এই মানবিক রূপায়ণই শিবায়নকে একটি সার্থক 'মঙ্গলকাব্য' বা 'শিবমঙ্গল' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রামেশ্বরের 'শিবসংকীর্তন' আজও তাই লোকায়ত বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

এই নোটটি আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যথাযথ হয়েছে কি?

 * আপনার কি এই সেমিস্টারের জন্য অন্য কোনো বিষয় যেমন— অন্নদামঙ্গল বা চৈতন্যজীবনী সাহিত্যের নোট প্রয়োজন?

 * প্রয়োজনে আমি এই উত্তরের একটি সারসংক্ষেপ (Summary) তৈরি করে দিতে পারি।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...