Skip to main content

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র ঠাকুরঝি। এই চরিত্রটি রক্ত-মাংসের মানবী থেকে কীভাবে নিতাইয়ের হৃদয়ে এক অপার্থিব 'কাব্যলক্ষ্মী'তে রূপান্তরিত হয়েছে? আলোচনা করো।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র ঠাকুরঝি। এই চরিত্রটি রক্ত-মাংসের মানবী থেকে কীভাবে নিতাইয়ের হৃদয়ে এক অপার্থিব 'কাব্যলক্ষ্মী'তে রূপান্তরিত হয়েছে? আলোচনা করো, ষষ্ঠ সেমিস্টার।

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কালজয়ী উপন্যাস কবি।আর সেই কবি উপন্যাসের একটি মুখ্য রক্ত মাংসের নারী চরিত্র ঠাকুরঝি।আসলে তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসে ঠাকুরঝি চরিত্রটি বাস্তব আর কল্পনার এক অপূর্ব মিশেল। সে একদিকে যেমন অভাব-অনটন আর সামাজিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ এক পল্লীবধূ। আবার অন্যদিকে সে কবিয়াল নিতাইয়ের শিল্পসত্তার ধ্রুবতারা।তাই ঠাকুরঝি কেবল একটি চরিত্র নয়, সে নিতাইয়ের জীবনদর্শনের এক গভীর সংবেদনা। আর সেই গভীর সংবেদনার মধ্যে ঠাকুরঝি একজন-

      • রক্ত-মাংসের মানবীর লৌকিকরূপ। আর সেই রূপের মধ্যে আমরা ঠাকুরঝিকে উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি এক অতি সাধারণ গ্রামীণ নারী হিসেবে। তার পরিচয় ও অস্তিত্ব লৌকিক জগতের সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। যেখানে তার সামাজিক পরিচয়ে দেখি-সে এক গোপবালা, বিবাহিতা এবং পরস্ত্রী। তার জীবনের পরিধি গোয়ালঘর, দুধের হাঁড়ি আর সংসারের কঠোর নিয়মে সীমাবদ্ধ। শুধু তাই নয়-

          ঠাকুরঝি শারীরিক রূপের দিক থেকে সুন্দরী নয়, সে 'কালো'। এই কালো রং তাকে সমাজের চোখে সাধারণ করে রাখলেও, তার অন্তরে ছিল এক গভীর নারীত্ব।তাই তার মধ্যে আছে মানবিক দুর্বলতা ও আবেগ।যেখানে নিতাইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না।তাই নিতাই যখন গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, তখন তার হৃদয়ের হাহাকার, লুকানো কান্না এবং পরবর্তীকালে নিতাইয়ের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা-এসবই প্রমাণ করে সে রক্ত-মাংসের এক আবেগময় মানবী। তার ঈর্ষা, অভিমান এবং ভালোবাসার আর্তি তাকে বাস্তবের মাটিতেই প্রতিষ্ঠিত করে। সেখানে এক গভীর ভালোবাসার মোড়কে ঠাকুরঝির দেখতে পাওয়া যায়-

        •অলৌকিক সত্তা, নিতাইয়ের 'কাব্যলক্ষ্মী'রূপে ঠাকরঝিকে।আসলে নিতাই চরিত্রের কবিসত্তা বিকাশের মূলে রয়েছে ঠাকুরঝি। সাধারণ এক কালো মেয়ে কীভাবে এক কবির কাছে সৃষ্টির প্রেরণা বা 'কাব্যলক্ষ্মী' হয়ে ওঠে, তা-ই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। আর সেখানেই আমরা খুঁজে পাই  সৌন্দর্যের নতুন দিশা। নিতাইয়ের চোখে ঠাকুরঝির কালো রূপই পরম সুন্দর। তার সেই বিখ্যাত গানটি লক্ষ্যণীয়ভাবে পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে-

"কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদো কেন? / কালো চোখের তারা দিয়ে জগত দেখা জানো না কি?"

      এখানে ঠাকুরঝি আর সাধারণ মানবী নেই; সে হয়ে উঠেছে পরম সুন্দরের এক নতুন প্রতীক নিতাই এর জীবনে। আর সেই জীবনে নিতাইয়ের যা কিছু শ্রেষ্ঠ গান, তার উৎস ঠাকুরঝি। সে না থাকলে নিতাই হয়তো একজন সাধারণ লেটো দলের শিল্পী হয়েই থেকে যেত। ঠাকুরঝির সান্নিধ্য এবং তার বিরহ-উভয়ই নিতাইকে একজন প্রকৃত 'কবি' হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেখানে ঠাকুরঝি নিতাইয়ের কাছে পবিত্রতার প্রতীক। নিতাইয়ের জীবনে 'বসন্ত' বা ঝুমুর দলের মেয়েরা এলেও, ঠাকুরঝি তার কাছে এক বিশেষ উচ্চতায় আসীন। সে তার কাছে কামনার সামগ্রী নয়, বরং আরাধনার দেবী।তাই নিতাইকে বলতে শুনি -

"তুমি আমার মানসী, তুমি আমার গানের লক্ষ্মী।"

৩. জীবন ও কাব্যের সন্ধিস্থল নিতাইয়ের জীবনে ঠাকরঝি।ঠাকুরঝি চরিত্রটি আসলে বাস্তবের মাটি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে কাব্যের আকাশে ডানা মেলা এক সত্তা। উপন্যাসের শেষে যখন ঠাকুরঝি মৃত্যুবরণ করে, তখন নিতাইয়ের কাছে সে আর কোনো নশ্বর দেহধারী নারী থাকে না। সে মিশে যায় নিতাইয়ের গানের সুরে, প্রকৃতির প্রতিটি ছন্দে। আরতারাশঙ্কর দেখিয়েছেন-লৌকিক প্রেম যখন চরম বিরহ আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তা অলৌকিক শিল্পে রূপান্তরিত হয়। ঠাকুরঝি তার মর্ত্যের শরীর ত্যাগ করলেও নিতাইয়ের কাব্যে সে অমর হয়ে থাকে।আর সেখানে উপন্যাসের এক জায়গায় ঠাকুরঝির প্রতি নিতাইয়ের মনোভাব ব্যক্ত হয়-

 "ঠাকুরঝি তো শুধু মেয়েমানুষ নয়, সে যেন কবির কাব্য-লক্ষ্মী। কবির চোখে সে ধরা দেয় ভিন্ন রূপে।"

         এই মনোভাব স্পষ্ট করে দেয় যে, ঠাকুরঝি চরিত্রটি কেবল রক্ত-মাংসের মানবীর সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। সে কবির চেতনার সেই রন্ধ্রপথ, যেখান দিয়ে সৃষ্টিশীলতার আলো প্রবেশ করে।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , ঠাকুরঝি চরিত্রটি আলোচ্য কবি উপন্যাসে এক দ্বিমাত্রিক ভূমিকা পালন করেছে।যেখানে ঠাকরঝি রক্ত-মাংসের মানবী বলেই তার বিরহ আমাদের কাঁদায়, আবার সে 'কাব্যলক্ষ্মী' বলেই নিতাইয়ের গান আমাদের মুগ্ধ করে।আসলে সে বাস্তবের সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নিতাই তার স্বপ্নের ইমারত গড়েছে। তাই ঠাকুরঝি কেবল মানবী বা কেবল দেবী নয়-সে রক্ত-মাংসের মানবী হয়েও নিতাইয়ের সৃজনশীলতার চিরন্তন কাব্যলক্ষ্মীরূপে প্রতিষ্ঠিত।

 ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "SHESHER KABITA SUNDARBON"YouTube channel SAMARESH sir 

Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...