ধর্মমঙ্গলকে কেন রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলে অভিহিত করা হয়?এই কাব্যধারার একজন শ্রেষ্ঠ কবির(ঘনারাম চক্রবর্তী )কৃতিত্ব আলোচনা করো। প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
ধর্মমঙ্গলকে কেন রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলে অভিহিত করা হয়?এই কাব্যধারার একজন শ্রেষ্ঠ কবির(ঘনারাম চক্রবর্তী )কৃতিত্ব আলোচনা করো।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ধারায় ধর্মমঙ্গল কাব্য এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গের (বর্তমানে বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর অঞ্চল) লৌকিক সমাজ, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামী চেতনার বহিঃপ্রকাশ এই কাব্যে যেভাবে ঘটেছে, তা আর কোনো কাব্যে মেলেনি। এই কারণেই ড. সুকুমার সেন এবং ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য ধর্মমঙ্গলকে "রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য" বলে অভিহিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো এই কাব্যকে কেন রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলা হয়?এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা অবশ্যই বলতে পারি-ধর্মমঙ্গলকে রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ বর্তমান: ভৌগোলিক পটভূমি, সামাজিক বৈচিত্র্য এবং লৌকিক বীরত্ব।যেখানে -
রাঢ়ের জনজীবন ও ভূগোলের তথ্যময় ধর্মমঙ্গল কাব্যখানি।ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রতিটি পাতায় রাঢ়ের মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এই কাব্যের প্রধান চরিত্র লাউসেনের বীরত্বের কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে অজয়, দামোদর এবং ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে। রাঢ়ের রুক্ষ প্রকৃতি, লাল মাটি এবং অরণ্যসংকুল পরিবেশের যে বাস্তবচিত্র এখানে পাওয়া যায়, তা চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলে তুলনামূলকভাবে কম।আবার এরই পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই-
অনার্য ও অন্ত্যজ সমাজের প্রাধান্য।ধর্মমঙ্গল কাব্য মূলত নিম্নবর্গের মানুষের কাহিনী। এখানে কালু ডোম ও তার স্ত্রী লখ্ণা (লক্ষণার) মতো বীর-বীরঙ্গনারা প্রধান ভূমিকা পালন করে। ডোম, বাগদি, হাড়ি প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সুখ-দুঃখ, তাদের যুদ্ধবিদ্যা এবং তাদের দেবতা 'ধর্মঠাকুর'-এর জয়গান এই কাব্যের মূল বিষয়। রাঢ়ের আদিবাসীদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে এটি জাতীয় স্তরে উন্নীত করেছে।শুধু তাই নয়, এই কাব্যের মূলে আছে-
বীররস ও সংগ্রামী চেতনা।অন্যান্য মঙ্গলকাব্য যেখানে মূলত ভক্তিপ্রধান (যেমন মনসা বা চণ্ডী), সেখানে ধর্মমঙ্গল হলো বীররসপ্রধান। লাউসেনের অমানুষিক কৃচ্ছ্রসাধন এবং হাকন্দ পুরাণে নিজের মাথা কেটে উৎসর্গ করার কাহিনী বীরত্বের পরাকাষ্ঠা। রাঢ়ের সাধারণ মানুষ যে পরাক্রমী ও স্বাধীনচেতা হতে পারে, ধর্মমঙ্গল তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এটি কেবল ধর্মীয় কাব্য নয়, বরং রাঢ়ের বীরত্বের ইতিহাস বা মহাকাব্য।
ধর্মমঙ্গল কাব্যধারার শ্রেষ্ঠ কবি: ঘনরাম চক্রবর্তীর কৃতিত্ব
ধর্মমঙ্গল কাব্যধারার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ঘনরাম চক্রবর্তী সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে স্বীকৃত। ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে (১৬৩৩ শকাব্দ) তিনি তাঁর অমর সৃষ্টি 'শ্রীধর্মসংগীত' বা 'ধর্মমঙ্গল' রচনা করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য বর্ধমানরাজ কীর্তিচন্দ্র তাঁকে 'কবিরত্ন' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।মঙ্গল কাব্যধারার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ঘনরাম চক্রবর্তী শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর 'শ্রীধর্মসংগীত' বা 'ধর্মমঙ্গল' কাব্যটি রচনা সমাপ্ত করেন।আর তাঁর কৃতিত্বের প্রধান দিকগুলি হলো-
•নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল কাহিনী বিন্যাসে ঘনারাম চক্রবর্তী শ্রেষ্ঠ কবি।ঘনরামের আগে রূপরাম চক্রবর্তী বা অন্যান্য কবিরা ধর্মমঙ্গল লিখলেও, কাহিনী বিন্যাসের দিক থেকে ঘনরামের কাব্য ছিল সবচেয়ে বেশি সংহত। তিনি মোট ২৪টি পালায় লাউসেনের জন্ম থেকে স্বর্গারোহণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কাহিনীকে একটি মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন। কাহিনীর গতিময়তা এবং বিভিন্ন উপকাহিনীর সার্থক সমন্বয় তাঁর অন্যতম বড় কৃতিত্ব।
•চরিত্র সৃষ্টিতে মুন্সিয়ানা।ঘনরাম কেবল লাউসেনকে নয়, খলচরিত্র হিসেবে মহামদ এবং বীর নারী চরিত্র হিসেবে কানাড়া ও লখ্ণা-কে অত্যন্ত জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন। কালু ডোমের লড়াইয়ের দৃশ্যে তিনি দেখিয়েছেন যে নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষও দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারে।বিশেষ করে ইছাই ঘোষের মতো প্রতাপশালী প্রতিপক্ষের বীরত্ব বর্ণনায় তিনি যে নিরপেক্ষতা দেখিয়েছেন, তা বিরল। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো কেবল রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং এক একটি আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
•বীররসের সার্থক রূপায়ণ।অধিকাংশ মঙ্গলকাব্য যেখানে ভক্তিপ্রধান, ঘনরামের ধর্মমঙ্গল সেখানে মূলত বীররসপ্রধান। লাউসেনের একের পর এক অসাধ্য সাধন, যুদ্ধযাত্রা এবং বীরোচিত আত্মত্যাগের কাহিনী বর্ণনায় তিনি এক মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য বজায় রেখেছেন। রাঢ় অঞ্চলের লৌকিক শৌর্য-বীর্য তাঁর লেখনীতে চিরস্থায়ী রূপ পেয়েছে।
•সমাজ ও ইতিহাসের প্রতিফলন ধর্মমঙ্গল কাব্যে।ঘনরামের কাব্যে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিন্যাসের এক স্বচ্ছ ছবি পাওয়া যায়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সংঘাত, রাজার সাথে সামন্তদের সম্পর্ক এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর কাব্যে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি একই সাথে রাঢ়ের ভূগোল ও লোকসংস্কৃতির সার্থক রূপকার।
•শব্দশৈলী ও অলঙ্কার প্রয়োগে শ্রেষ্ঠ দাবীদার।ঘনরামের ভাষা ছিল অত্যন্ত সংস্কৃতঘেঁষা এবং মার্জিত। তিনি শব্দের কারুকার্যে পটু ছিলেন বলে তাঁকে 'কবিরত্ন' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কাব্যে অনুপ্রাস, শ্লেষ ও যমক অলঙ্কারের প্রাচুর্য দেখা যায়। বীররসের বর্ণনায় তাঁর ভাষা যেমন ওজস্বী, করুণ রসের বর্ণনায় তেমনই কোমল।
•ঐতিহাসিক গুরুত্ব।ঘনরামের কাব্যে তৎকালীন গৌড় বা বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিন্যাসের একটি ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সংঘাত এবং সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,উপমা, চিত্রকল্প এবং আখ্যানের গভীরতায় ঘনরাম চক্রবর্তী মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তাঁর 'কবিরত্ন' উপাধি যে সার্থক ছিল, তা তাঁর কাব্যের শিল্পসুষমা বিচার করলেই বোঝা যায়। আধুনিক গবেষকদের মতে, ধর্মমঙ্গলকে 'রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে ঘনরামের অবদানই সবচেয়ে বেশি।তবে-
ধর্মমঙ্গল কাব্যটি কেবল ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের মাধ্যম নয়, এটি ছিল রাঢ় বাংলার অন্ত্যজ মানুষের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক সংগ্রাম। ঘনরাম চক্রবর্তী তাঁর অসামান্য কবিত্বশক্তি দিয়ে এই লৌকিক কাহিনীকে মহাকাব্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তাঁর বর্ণনাশৈলী এবং চরিত্রায়ণের গভীরতাই তাঁকে এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবির আসনে বসিয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "SHESHER KABITA SUNDARBON" YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment