Skip to main content

সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের তুলনামূলক আলোচনা করো।

সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের তুলনামূলক আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা প্রথম সেমিস্টার মেজর)।

           আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শাক্ত পদাবলীর ইতিহাসে রামপ্রসাদ হলেন প্রবর্তক এবং কমলাকান্ত হলেন তার সার্থক অনুবর্তী। উভয়েই সাধক-কবি হলেও তাঁদের কাব্যরীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আর সেই পার্থক্য গুলি হল যথাক্রমে-

       •সাধনা ও কাব্যের পটভূমির বৃষ্টিতে বলা যায় যে অষ্টাদশ শতাব্দীর যুগযন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে রামপ্রসাদের আবির্ভাব।তাই তাঁর পদাবলীতে সমকালীন বাংলার দারিদ্র্য, অরাজকতা এবং সাধারণ মানুষের হাহাকার ধরা পড়েছে। তিনি দেবী কালীকে ঘরের আপনজন, কখনো জননী আবার কখনো কন্যা (উমা) রূপে দেখেছেন। কিন্তু-

         •কমলাকান্ত ভট্টাচার্য উনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের কবি। বর্ধমান রাজসভার আশ্রয়ে থাকায় তাঁর জীবনে রামপ্রসাদের মতো চরম দারিদ্র্য ছিল না। তাই তাঁর পদে রামপ্রসাদের মতো আর্তস্বর অপেক্ষা দার্শনিক গাম্ভীর্য বেশি দেখা যায়।

       •বাৎসল্য ও ভক্তিভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রামপ্রসাদের ভক্তি ছিল সরল ও আবদারমাখা। তিনি মাকে কখনো গালি দিয়েছেন, কখনো অভিমান করেছেন ("মা নিম খাওয়ালে চিনি বলে / কথাটি মিষ্ট কিন্তু কাজে তিতো")। তাঁর পদে বাৎসল্য রস অত্যন্ত প্রবল এবং গ্রাম্য জীবনের ছোঁয়া যুক্ত। কিন্তু -

        •কমলাকান্তের ভক্তি অনেকটা গম্ভীর এবং ধীরস্থির। তিনি মাকে বিশ্বজননী ও ব্রহ্মময়ী রূপে দেখেছেন। তাঁর পদে ভক্তিভাবের সাথে জ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

       •দার্শনিকতা ও তন্ত্রতত্ত্ব দিক দিয়ে রামপ্রসাদ তন্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব জানতেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তিনি তত্ত্বকে সহজ করে প্রকাশ করেছেন। "মন রে কৃষিকাজ জানো না" পদে তিনি রূপকের সাহায্যে জীবনের তত্ত্ব বুঝিয়েছেন। কিন্তু-

       •কমলাকান্ত ছিলেন উচ্চস্তরের তান্ত্রিক সাধক। তাঁর পদে যোগতত্ত্ব, কুণ্ডলিনী শক্তি এবং ষটচক্রভেদের মতো জটিল তত্ত্বের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর অনেক পদ সাধনার গূঢ় রহস্যে আবৃত।

     • শিল্পশৈলী ও ভাষার দিক থেকে রামপ্রসাদ ভাষা ছিল একান্তই গ্রাম্য ও লৌকিক। লোকজীবন থেকে নেওয়া উপমা (যেমন— ঘুড়ি ওড়ানো, কৃষিকাজ, মকদ্দমা) তাঁর পদের প্রাণ। তিনি মূলত 'প্রসাদী সুর' নামক এক নিজস্ব সুরের স্রষ্টা। কিন্তু-

       ‌‌ • কমলাকান্তের ভাষা মার্জিত, সংস্কৃত শব্দবহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে বৈষ্ণব পদাবলীর মতো অলঙ্কারপূর্ণ। তাঁর 'শ্যামাসঙ্গীত' সুর ও তালের বিচারে অনেক বেশি ধ্রুপদী ও রাগাশ্রয়ী।

          মোটকথা হলো,দৃষ্টিভঙ্গি দিক থেকে রামপ্রসাদ সেন ভাববাদী ও আবেগপ্রধান, আর কমলাকান্ত তত্ব ও দর্শন প্রধান। আবার ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রামপ্রসাদ লৌকিক ও সহজ-সরল, আর কমলাকান্ত মার্জিত ও অলঙ্কারবহুল ভাষা প্রয়োগে সিদ্ধহস্ত। তবে রামপ্রসাদ সেনের পদাবলীতে প্রাত্যহিক জীবনের ঘরোয়া চিত্র দেখা যায়, অপরপক্ষে কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের পদাবলীতে আধ্যাত্মিক ও তান্ত্রিক অনুষঙ্গ লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়  রামপ্রসাদ সেনের পদাবলীতে সাধারণ মানুষের দুঃখ-সুখের কথা শোনা যায়, আর কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের পদাবলীতে সাধক ও জ্ঞানীদের আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা বিস্তর জায়গা দখল করে আছে।

           পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রামপ্রসাদ যদি হন শাক্ত পদাবলীর ‘ভোরের পাখি’, তবে কমলাকান্ত হলেন তার ‘দুপুরের প্রখর সূর্য’। রামপ্রসাদ মাকে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে এনেছেন, আর কমলাকান্ত ভক্তকে সাধনার মাধ্যমে অলৌকিক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই দুই কবির দানই অবিস্মরণীয়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন ও টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir 

Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...