Skip to main content

ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থে শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনে মা চঞ্চলা দেবীর প্রভাব আলোচনা করো।

ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থে শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনে মা চঞ্চলা দেবীর প্রভাব আলোচনা করো।

          শিবরাম চক্রবর্তীর আত্মজীবনী 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনদর্শন। এই গ্রন্থে তাঁর মা চঞ্চলা দেবী কেবল একজন জন্মদাত্রী নন, বরং শিবরামের যাযাবর ও নিরাসক্ত জীবনের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিভাত হয়েছেন। শিবরামের জীবনে চঞ্চলা দেবীর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং মানসিক গঠনের মূল কারিগর।আসলে-

           চঞ্চলা দেবী ছিলেন সাধারণ বাঙালি বধূর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ছিলেন তেজস্বিনী এবং স্বাধীনচেতা। শিবরামের পিতা শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী যখন আধ্যাত্মিকতার টানে ঘর ছাড়েন, তখন চঞ্চলা দেবী ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে তিনি সন্তানদের মানুষ করেছেন। শিবরামের মধ্যে যে প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রবণতা দেখা যায়, তার বীজ লুকিয়ে ছিল তাঁর মায়ের চরিত্রে।গ্রন্থে শিবরাম লিখেছেন-

"মা ছিলেন যেন এক আগ্নেয়গিরি—বাইরে শান্ত কিন্তু ভেতরে তাঁর তেজ ছিল প্রচণ্ড। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা তাঁর স্বভাবে ছিল না।"

         শিবরামের জীবনে ঘর না বাঁধার যে অদ্ভুত মানসিকতা, তা অনেকাংশেই তাঁর মায়ের জীবনযুদ্ধ থেকে পাওয়া। চঞ্চলা দেবী মালদহের চাঁচল রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন। তাঁর এই নিরাসক্তি শিবরামকে শিখিয়েছিল পার্থিব বস্তুর প্রতি মায়া ত্যাগ করতে। মুক্তকচ্ছ জীবন আর মুক্তচিন্তার যে শৈলী শিবরামের লেখায় পাওয়া যায়, তার মূলে ছিল মায়ের দেওয়া সেই মানসিক স্বাধীনতা।আর সেখানে-

       শিবরামের বাবা যখন সন্ন্যাসী হয়ে 'স্বামী দয়ানন্দ' নাম নিয়ে তীর্থে ঘুরছেন, মা তখন মর্ত্যের পৃথিবীতে লড়াই করছেন। চঞ্চলা দেবী বিশ্বাস করতেন মানুষের সেবায়। তিনি কোনো অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং মাটির পৃথিবীর কঠোর বাস্তবকে মেনে নিয়েছিলেন। শিবরাম তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বাবার আধ্যাত্মিকতা তাঁকে টানলেও মায়ের বাস্তববোধই তাঁকে শেষ পর্যন্ত 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা'র তত্ত্বে স্থির করেছিল।

          চঞ্চলা দেবী অভাবের মধ্যেও মানুষকে দান করতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর এই পরোপকারী স্বভাব শিবরামের চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। শিবরাম পরবর্তী জীবনে মেসে থেকে যে অনাড়ম্বর জীবন কাটিয়েছেন এবং নিজের সামান্য আয়ের টাকা যেভাবে মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন, তা ছিল মায়ের শিক্ষারই প্রতিফলন।মা সম্পর্কে শিবরামের উপলব্ধি ছিল-

"বাবা দিলেন ঈশ্বরকে খোঁজার পথ, আর মা চেনালেন পৃথিবীর মানুষকে ভালোবাসার ধর্ম।"

         শিবরামের লেখনীতে যে সূক্ষ্ম শ্লেষ এবং জীবনকে নিয়ে রসিকতা করার ক্ষমতা দেখা যায়, তার অনেকটা অংশই ছিল মায়ের থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার। চঞ্চলা দেবীর চারপাশের মানুষের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর এবং যেকোনো পরিস্থিতিকে সহজভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতা শিবরামকে একজন সার্থক পর্যবেক্ষক করে তুলেছিল।

        পরিশেষে বলা যায় যে,শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনে চঞ্চলা দেবী ছিলেন ধ্রুবতারার মতো। তাঁর কঠোর ব্যক্তিত্বের আড়ালে ছিল এক বিশাল হৃদয়, যা শিবরামকে শিখিয়েছিল কীভাবে নিঃস্ব হয়েও বিশ্বকে জয় করা যায়। 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থে মা চঞ্চলা দেবী কেবল একটি চরিত্র নন, বরং শিবরামের জীবনের এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir 




Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...