উপভাষা কাকে বলে? উপভাষার বৈশিষ্টগুলি লেখো। বাংলা ভাষায় উপভাষাগুলি কী কী? (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।
•উপভাষার সংজ্ঞাঃএকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের অন্তর্গত মূল ভাষার যে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বা স্থানীয় রূপ লক্ষ করা যায়, তাকে উপভাষা বলে। ভৌগোলিক ব্যবধান, পরিবেশ এবং সামাজিক মেলামেশার পার্থক্যের কারণে একই ভাষার মধ্যে উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার এবং ব্যাকরণগত যে রূপভেদ তৈরি হয়, তা-ই উপভাষা।প্রখ্যাত ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে—
"একটি মূল ভাষার অন্তর্গত কয়েকটি আঞ্চলিক রূপকে উপভাষা বলা হয়।"
•উপভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহঃউপভাষাকে চেনার জন্য বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়-
•ভৌগোলিক সীমারেখা: উপভাষা মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
•উচ্চারণভঙ্গি: অঞ্চলভেদে শব্দের উচ্চারণ ও সুরের পরিবর্তন ঘটে। যেমন— কোনো অঞ্চলে 'স' ধ্বনি 'হ'-এর মতো উচ্চারিত হয়।
•শব্দভাণ্ডার: একই বস্তুকে বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন উপভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয় (যেমন— কোথাও 'লবণ', কোথাও 'নুন')।
•ব্যাকরণগত পার্থক্য: বিশেষ্য বা ক্রিয়াপদের বিভক্তি এবং প্রত্যয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে উপভাষাভেদে পার্থক্য দেখা যায়।
•কথ্য রূপ: উপভাষা মূলত মুখের ভাষা হিসেবেই বেশি প্রচলিত, যদিও আধুনিক সাহিত্যে এর সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়।
•বাংলা ভাষার উপভাষা ও তাদের বিস্তৃতি-বাংলা ভাষাকে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী প্রধানত পাঁচটি উপভাষায় ভাগ করা হয়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
ক) রাঢ়ী উপভাষাঃএটি পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভাষা। আধুনিক চলিত বাংলা ভাষার ভিত্তি হলো এই রাঢ়ী উপভাষা।
•অঞ্চল: কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং পূর্ব বর্ধমান।
•বৈশিষ্ট্য: অভিশ্রুতি ও স্বরসংগতির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: 'বলিয়া' > 'বলে', 'করিয়া' > 'করে'।
খ)বঙ্গালী উপভাষাঃএটি মূলত পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের ভাষা।
•অঞ্চল: ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর এবং শ্রীহট্ট (সিলেট)।
•বৈশিষ্ট্য: এখানে 'এ' ধ্বনি অনেক সময় 'অ্যা' (æ) হিসেবে উচ্চারিত হয়। এছাড়া 'শ/ষ/স' ধ্বনির জায়গায় 'হ' উচ্চারণের প্রবণতা থাকে (যেমন: 'সকল' > 'হকল')।
গ)কামরূপী উপভাষাঃউত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন অঞ্চলের ভাষাকে কামরূপী বলা হয়। একে অনেক সময় 'রাজবংশী' ভাষাও বলা হয়।
• অঞ্চল: কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং (সমতল), দিনাজপুর এবং অসমের গোয়ালপাড়া।
•বৈশিষ্ট্য: এখানে অনুনাসিক ধ্বনির অভাব দেখা যায় এবং ক্রিয়াপদের রূপে স্বকীয়তা থাকে। যেমন: 'মোর' (আমার), 'তোর' (তোমার)।
ঘ)বরেন্দ্রী উপভাষাঃপ্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত জেলাগুলোতে এই উপভাষা প্রচলিত।
অঞ্চল: মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বাংলাদেশের রাজশাহী ও পাবনা জেলা।
বৈশিষ্ট্য: শব্দের শুরুতে 'র' স্থানে 'অ' বা 'হ' উচ্চারণের প্রবণতা থাকে। কথা বলার সময় একটি টান বা সুরের ব্যবহার দেখা যায়।
ঙ)ঝাড়খণ্ডী উপভাষাঃপশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত এলাকার আদিবাসী প্রভাবযুক্ত ভাষাকে ঝাড়খণ্ডী উপভাষা বলে।
অঞ্চল: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর।
•বৈশিষ্ট্য: এখানে স্বরবর্ণের অনুনাসিকতা (যেমন: চাঁদ, বাঁশ) খুব বেশি স্পষ্ট। এছাড়া 'ল' ধ্বনির জায়গায় 'ন' ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
উপভাষা কোনো ভাষার বিকৃত রূপ নয়, বরং এটি ভাষার বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির পরিচয় দেয়। এই পাঁচটি উপভাষার মেলবন্ধনেই বাংলা ভাষা আজ একটি সমৃদ্ধ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
Comments
Post a Comment