ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থে শিবরাম চক্রবর্তীর রাজনৈতিক আন্দোলনের যোগদান ও কারাবাসের অভিজ্ঞতার পরিচয় দাও।
ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা গ্রন্থে শিবরাম চক্রবর্তীর রাজনৈতিক আন্দোলনের যোগদান ও কারাবাসের অভিজ্ঞতার পরিচয় দাও (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
শিবরাম চক্রবর্তীর আত্মজীবনী 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' কেবল হাস্যকৌতুক বা নিরাসক্ত জীবনের আখ্যান নয়, এটি তাঁর দেশপ্রেম এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়কেও ধারণ করে আছে। এই গ্রন্থে তিনি তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান এবং জেল খাটার অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত অথচ শাণিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আর সেই বর্ণনায় উঠে এসেছে শিবরামের রাজনীতি ও কারাবাস। যেখানে আমরা দেখি-
শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনে রাজনীতি ছিল এক আকস্মিক কিন্তু গভীর ঝোড়ো হাওয়ার মতো। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মালদহের এক কিশোর দেশমাতৃকার টানে ঘর ছেড়ে কলকাতার ফুটপাতে আস্তানা গেড়েছিলেন এবং জড়িয়ে পড়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে।রাজনীতিতে যোগদান ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সান্নিধ্য। সেখানে -
শিবরাম যখন ছোট, তখন সারা ভারতে গান্ধীজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। শিবরাম এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। শিবরামের কথায়-
"দেশবন্ধুই ছিলেন আমাদের আসল নেতা। তাঁর ব্যক্তিত্বের জাদুতেই আমরা বাড়ির মায়া কাটিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম।"
আসলে শিবরাম চক্রবর্তীর তীক্ষ্ণ লেখনী ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক বড় হাতিয়ার।যেখানে -
ব্রিটিশ বিরোধী প্রচারপত্র বিলি এবং রাজদ্রোহের অভিযোগে শিবরামকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি প্রকাশ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এবং বিপ্লবী কবিতা ছড়াচ্ছিলেন। বিচারে তাঁর জেল দণ্ড হয়। মজার বিষয় হলো, জেলযাত্রাকে তিনি কোনো ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছিলেন এক নতুন অভিজ্ঞতার জানালা হিসেবে।কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে। আর সেখানে আমরা দেখি-
শিবরামের কারাবাসের অধিকাংশ সময় কেটেছে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। সেখানে তিনি সহবন্দী হিসেবে পেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু এবং চিত্তরঞ্জন দাশের মতো মহীরুহদের। জেলের কয়েদি জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন-
"জেলখানাটা ছিল এক বিচিত্র জায়গা। সেখানে চোর-ডাকাতের পাশে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বসে দেশের ভবিষ্যৎ আলোচনা করছে।"
আসলে জেলে থাকাকালীন শিবরামের নিরাসক্ত মনোভঙ্গি ছিল দেখার মতো। তিনি জেলের খাবার বা কষ্ট নিয়ে অভিযোগ না করে বরং সহবন্দীদের বিচিত্র চরিত্র লক্ষ্য করতেন।তবে জেলে মানসিক পরিবর্তন ও নিরাসক্তি ছিল। তাই-
কারাবাস শিবরামের জীবনে এক বড় পরিবর্তন আনে। জেলের নির্জনতা এবং বৈচিত্র্যময় মানুষের সান্নিধ্য তাঁকে জীবন সম্পর্কে উদাসীন বা 'ডিটাচড' হতে শিখিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, জেলের ভেতরেও যেমন স্বাধীনতা থাকা সম্ভব, জেলের বাইরেও মানুষ শৃঙ্খলিত হতে পারে। তাঁর এই কারাবাসের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের দর্শনে (বিশেষ করে 'হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন' সিরিজের আপাত-নির্বুদ্ধিতার আড়ালে থাকা গভীর সত্য) প্রভাব ফেলেছিল। আর সেখান থেকেই আসে মুক্তি ও পরবর্তী জীবন। যেখানে -
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শিবরাম প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে আসেন এবং সাহিত্যকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করে তোলেন। তবে তাঁর দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক সচেতনতা কোনোদিন স্তিমিত হয়নি। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটা পথ।
অবশেষে আমরা বলতে পারি যে- 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা' গ্রন্থে শিবরাম চক্রবর্তী প্রমাণ করেছেন যে, বিপ্লব মানেই কেবল আগ্নেয়াস্ত্র হাতে লড়াই নয়, বরং কলম এবং আদর্শের জন্য হাসিমুখে কারাবরণও এক বড় লড়াই। তাঁর কারাবাসের অভিজ্ঞতা কোনো তিক্ততা সৃষ্টি করেনি, বরং জীবনকে 'ঈশ্বর' এবং 'পৃথিবী'র প্রেক্ষাপটে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment