যখন ছোট ছিলাম গ্রন্থে সত্যজিৎ রায়ের শৈশব ভ্রমণ বর্ণনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর)
'যখন ছোট ছিলাম' গ্রন্থটি সত্যজিৎ রায়ের শৈশব ও কৈশোরের এক অসামান্য চিত্রশালা। এই গ্রন্থে তাঁর শৈশব ভ্রমণের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা কেবল ভ্রমণের বিবরণ নয়, বরং এক ভবিষ্যৎ শিল্পীর চোখ দিয়ে দেখা বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষের চালচিত্র।সত্যজিৎ রায়ের শৈশব ছিল বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যখন ছোট ছিলাম'-এ আমরা দেখি, অল্প বয়সেই তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই ভ্রমণগুলি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও শৈল্পিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর সেখানে-
সত্যজিতের শৈশব স্মৃতির এক উজ্জ্বল অংশ জুড়ে আছে ওড়িশার পুরী। সমুদ্রের বিশালতা তাঁকে প্রথমবার প্রকৃতির অসীমতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তিনি লিখেছেন-
"পুরীতে গিয়ে আমার প্রথম যে জিনিসটা মনে হয়েছিল সেটা হল সমুদ্রের গর্জন। বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পায়ের আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালি ঢোকার সেই শিরশিরে অনুভূতি আজও মনে আছে।"
সমুদ্রের ঢেউয়ের খেলা এবং নোলিয়াদের জীবনযাত্রা তাঁর কৌতূহলী মনকে আবিষ্ট করেছিল। বালুচরে ঝিনুক কুড়ানো এবং সূর্যোদয় দেখার সেই দিনগুলো তাঁর পরবর্তী জীবনের দৃশ্যকাব্যের গভীর প্রভাব ফেলেছিল।আর সেখানে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ভ্রমণ ছিল তাঁর শৈশবের অন্যতম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের আনাগোনা এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। দার্জিলিং-এর সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন-
"মেঘের ভেতর দিয়ে পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মনে হত যেন অন্য কোনো এক জগতে চলে এসেছি।"
পাহাড়ের মানুষ, তাদের পোশাক-আশাক এবং ঘোড়ায় চড়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কিশোর মনকে চনমনে করে তুলত।যেখানে-
পারিবারিক সূত্রে সত্যজিৎ বিহারের গিরিডি এবং উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিলেন। গিরিডির উশ্রী নদীর ঝরনা এবং খন্ডোলি পাহাড়ের বর্ণনা তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই ভ্রমণে তিনি কেবল প্রকৃতি নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার বৈচিত্র্যও লক্ষ্য করেছিলেন। ট্রেনের জানলায় বসে বাইরের দৃশ্য দেখার যে মুগ্ধতা, তা পরবর্তীকালে তাঁর 'পথের পাঁচালী' বা 'অপুর সংসার'-এর সেই বিখ্যাত ট্রেন দেখার দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়
সত্যজিতের শৈশব ভ্রমণের বিশেষত্ব হলো তাঁর ডিটেইল বা খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি নজর। কোনো জায়গায় গেলে সেখানকার ঘরবাড়ি, মানুষের কথা বলার ধরন, এমনকি গায়ের চামড়ার রঙ পর্যন্ত তিনি খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন। এই পর্যটনলব্ধ অভিজ্ঞতা তাঁর অবচেতন মনে এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ফেলুদার গল্পে বিভিন্ন জায়গার নিখুঁত বর্ণনায় কাজে লেগেছিল।
শৈশবের এই ভ্রমণগুলোতে তাঁর সঙ্গে থাকতেন মা সুপ্রভা দেবী এবং আত্মীয়স্বজনেরা। ভ্রমণের সময় বড়দের মুখে শোনা গল্প এবং ঐতিহাসিক স্থানের মাহাত্ম্য তাঁর মধ্যে ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের প্রতি অনুরাগের জন্ম দিয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায় যে, সত্যজিৎ রায়ের কাছে শৈশব ভ্রমণ ছিল এক ধরণের 'চলমান শিক্ষা'। 'যখন ছোট ছিলাম' গ্রন্থে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, চার দেয়ালের বাইরের জগৎটাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। ভ্রমণের প্রতিটি বাঁক তাঁর শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং তাঁকে বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment