ঐতিহাসিক নাটক হিসাবে চন্দ্রগুপ্ত নাটকের সার্থকতা আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত' (১৯১১) নাটকটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি কেবল একটি দেশাত্মবোধক নাটক নয়, বরং ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি সার্থক ঐতিহাসিক নাটক।ঐতিহাসিক নাটক বলতে এমন এক নাট্যরীতিকে বোঝায় যেখানে ইতিহাসের পরিচিত কোনো ঘটনা বা চরিত্রকে ভিত্তি করে নাট্যকার সমকালীন জীবনসত্য বা চিরন্তন কোনো আদর্শকে তুলে ধরেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত এবং গ্রিক বীর সেকেন্দারের ভারত অভিযানের প্রেক্ষাপট নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
চন্দ্রগুপ্ত নাটকে ঐতিহাসিক পটভূমি ও তথ্যনিষ্ঠ বিষয়।যেখানে নাটকটির মূল ভিত্তি হলো খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের ভারত। মগধের সিংহাসন থেকে নন্দ বংশের উচ্ছেদ এবং গ্রিক সেনাপতি সেলুকাসের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের সংঘাত—এই ঐতিহাসিক সত্যকে নাট্যকার নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। নাটকে বর্ণিত চরিত্রগুলি যেমন—চন্দ্রগুপ্ত, চাণক্য, সেকেন্দার (আলেকজান্ডার), সেলুকাস এবং হেলেন—প্রত্যেকেই ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল। বিশেষ করে চাণক্যের কূটনীতি এবং চন্দ্রগুপ্তের শৌর্য ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করেছে।এর ই পাশাপাশি আমরা দেখি-
চন্দ্রগুপ্ত নাটকের চরিত্র চিত্রণ। ঐতিহাসিক নাটকের সার্থকতা নির্ভর করে ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে রক্ত-মাংসের চরিত্র সৃষ্টির ওপর।আর সেখানে নাটকের প্রাণভোমরা চাণক্য। তাঁর প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমার আদর্শ চরিত্রটিকে মহিমা দান করেছে।আবার গ্রিক বীর সেকেন্দারের মহানুভবতা ও রণকৌশল ইতিহাসের সত্যকে অনুসরণ করেছে।পাশাপাশি বীরত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে চন্দ্রগুপ্ত চরিত্রটি অঙ্কিত হয়েছে।
চন্দ্রগুপ্ত নাটকের নাটকীয় কল্পনা ও মানবিক আবেদন।ইতিহাস যেখানে নীরব, নাট্যকার সেখানে কল্পনার রঙ মিশিয়েছেন। ছায়াপথিক বা আন্তিগোণাসের মতো কিছু কাল্পনিক উপাদান থাকলেও তা ইতিহাসের মূল কাঠামোকে বিকৃত করেনি। বরং হেলেন ও চন্দ্রগুপ্তের প্রণয়-কাহিনী বা চাণক্যের অন্তরের দ্বন্দ্ব নাটকটিকে সাধারণ মানুষের কাছে হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে। ঐতিহাসিক নাটকে তথ্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে 'ঐতিহাসিক রস' যা দ্বিজেন্দ্রলাল সফলভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছেন।
চন্দ্রগুপ্ত নাটকের দেশাত্মবোধ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নাটকটি যখন রচিত হয় (১৯১১), তখন ভারত ব্রিটিশ শাসনাধীন। পরাধীন ভারতের মানুষকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে চন্দ্রগুপ্তের শৌর্য এবং চাণক্যের একতা স্থাপনের প্রয়াস ছিল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। "একি চমৎকার দেশ!"—সেকেন্দারের এই উক্তির মাধ্যমে ভারতের রূপ ও ঐতিহ্যকে যেভাবে বন্দনা করা হয়েছে, তা দর্শকদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ঐতিহাসিক নাটকের সাফল্যের শর্ত হলো-ইতিহাসের কঙ্কালে কল্পনার রক্ত-মাংস সংযোগ করে তাকে প্রাণবন্ত করা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তথ্যগত সূক্ষ্মতা, গম্ভীর সংলাপ এবং সুশৃঙ্খল প্লট নাটকটিকে একটি সার্থক ঐতিহাসিক নাটকের মর্যাদা দান করেছে।
Comments
Post a Comment