কবি উপন্যাসটি একটি সফল আঞ্চলিক উপন্যাস হিসেবে সার্থকতা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS14
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন এমন এক শিল্পী যিনি মাটির কাছাকাছি থাকা ব্রাত্য মানুষদের জীবনকথাকে অমর করে তুলেছেন। তাঁর ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত 'কবি' উপন্যাসটি কেবল একজন লোককবির আত্মপ্রকাশের কাহিনী নয়, বরং এটি বীরভূম অঞ্চলের মাটি, মানুষ এবং সংস্কৃতির এক অখণ্ড দলিল।যেখানে আঞ্চলিক উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই যে-
বাংলা উপন্যাসে 'আঞ্চলিকতা' একটি বিশেষ শিল্পরীতি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডল, সেখানকার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, সংস্কার এবং জীবনসংগ্রাম উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ‘কবি’ উপন্যাসটি বীরভূমের রুক্ষ রাঙামাটির এক অনন্য মহাকাব্য। কেবল কাহিনীর খাতিরে নয়, বরং বীরভূমের মৃত্তিকা সংলগ্ন ব্রাত্য মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কনেই এই উপন্যাসের সার্থকতা। আর সেই সার্থকতার পথ ধরে আমরা বলতে পারি-
•নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পটভূমির নিরিখে কবি উপন্যাস।আঞ্চলিক উপন্যাসের প্রথম শর্ত হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানকাল। ‘কবি’ উপন্যাসের পটভূমি বীরভূম জেলা। এখানের তাল-খেজুরের বন, কোপাই নদী, বীরভূমের লাল ধুলো ওড়া রাস্তা এবং রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন অঞ্চলের এক বিশেষ ছবি তারাশঙ্কর এঁকেছেন। উপন্যাসে জংশন স্টেশনটি কেবল একটি স্থান নয়, বরং তা আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে কাজ করেছে। যেখানে উঠে এসেছে-
• ব্রাত্য ও প্রান্তিক জনজীবনের ছবি।তারাশঙ্কর এই উপন্যাসে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সমাজের পরিবর্তে বীরভূমের অন্ত্যজ ও ব্রাত্য সমাজের মানুষদের বেছে নিয়েছেন। চোর-ডাকাতের বংশে জন্মেও নিতাইয়ের কবিয়াল হয়ে ওঠার আকুলতা আসলে ওই অঞ্চলের এক বিশেষ সামাজিক বিবর্তনকে সূচিত করে। ডোম, বাগদি এবং ঝুমুর দলের মানুষদের যাযাবর বৃত্তি, অভাব-অনটন এবং তাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলো এই উপন্যাসে অত্যন্ত জীবন্ত। আবার এরই পাশাপাশি উপন্যাসিক তুলে ধরেছেন-
•লোকসংস্কৃতি ও লোকসংগীতের বিষয়।আঞ্চলিক উপন্যাসের প্রাণ হলো সেই অঞ্চলের সংস্কৃতি। বীরভূমের লোকায়ত সংস্কৃতি—বিশেষ করে কবিগান এবং ঝুমুর গান—এই উপন্যাসের শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। নিতাইয়ের মুখ নিঃসৃত গানগুলো কেবল বিনোদন নয়, তা বীরভূমের মাটির সুর। আর সেই সুরে উঠে এসেছে-
"কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে? কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরে নয়ন ভোলে কেনে?"
আসলেএই গানের মধ্য দিয়ে যে সহজ-সরল অথচ গভীর জীবনদর্শন ফুটে উঠেছে, তা কেবল ওই অঞ্চলের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। শুধু তাই নয়, এই উপন্যাসে আমরা আরও দেখতে পাই যে-
• বিশেষ সমাজতত্ত্ব ও কুসংস্কার।বীরভূমের প্রান্তিক মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার এবং তাদের নৈতিকতাবোধ এই উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে। পৈতৃক পেশা (ডাকাতি) ছেড়ে নিতাই যখন শিল্পী হতে চায়, তখন সমাজ তাকে সহজে গ্রহণ করে না। আবার বসন বা ঠাকুরঝির প্রতি তার যে টান, তার মধ্যেও এক ধরনের লৌকিক সংস্কার ও আদিমতা মিশে আছে। ঠাকুরঝি চরিত্রটি যেন বীরভূমের বৈষ্ণবীয় প্রেমের এক শাশ্বত রূপ।আর সেই শাশ্বত রূপের মাঝে-
• আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ।উপন্যাসটির সংলাপে বীরভূমের আঞ্চলিক কথ্য ভাষার (Dialect) নিপুণ ব্যবহার একে বাস্তবধর্মী করে তুলেছে। চরিত্রের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী ভাষার এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন আঞ্চলিক উপন্যাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া প্রকৃতির রুক্ষতা মানুষের চরিত্রে যে কাঠিন্য ও আবেগ তৈরি করে, তারাশঙ্কর তা সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।এছাড়াও উপন্যাসে আমরা পাই-
জীবনদর্শন ও আঞ্চলিকতা।আঞ্চলিকতার সীমা ছাড়িয়ে 'কবি' যখন বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে, তখনই তা মহৎ উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে। নিতাইয়ের সেই বিখ্যাত হাহাকার-
"জীবন এত ছোট কেনে? এ জীবনে মিটিল না সাধ..."
আসলে এটি কেবল বীরভূমের ডোম বংশের এক কবির আর্তনাদ নয়, এটি চিরন্তন মানবাত্মার অতৃপ্তির সুর। কিন্তু এই সুরটি অনুরণিত হয়েছে বীরভূমের রুক্ষ ধূসর পটভূমিতেই।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূমের আলো-হাওয়া, ধুলো-কাদা আর মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে তুলির টানে জীবন্ত করেছেন। নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থেকেও তিনি মানবজীবনের শাশ্বত সত্যকে অন্বেষণ করেছেন। বীরভূমের ভৌগোলিক পরিবেশ, সমাজকাঠামো এবং লোকসংস্কৃতির সার্থক সমন্বয়ে ‘কবি’ বাংলা সাহিত্যের একটি ধ্রুপদী আঞ্চলিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।
Comments
Post a Comment