Skip to main content

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল: সমকালীন অবক্ষয়িত সমাজ জীবনের শিল্প-সংগীত আলোচনা করো।

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল: সমকালীন অবক্ষয়িত সমাজ জীবনের শিল্প-সংগীত আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) প্রথম সেমিস্টারের বাংলা মেজর (NEP) সিলেবাস)

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অষ্টাদশ শতাব্দী বাংলার ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল।যে সময়ে একদিকে মুঘল শাসনের ভগ্নদশা, অন্যদিকে উদীয়মান ইংরেজ শক্তি ও বর্গীর হাঙ্গামা-সব মিলিয়ে এক চরম অরাজকতা ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করেছিল।আর এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ (১৭৫২) কাব্যে যে সমাজচিত্র এঁকেছেন, তা কেবল দেবীর মহিমা কীর্তন নয়, বরং সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের এক জীবন্ত দলিল। ড. সুকুমার সেনের মতে- "ভারতচন্দ্র ছিলেন যুগসন্ধির কবি", আর তাঁর কাব্য সেই যুগের অবক্ষয়িত জীবনেরই এক নিপুণ ‘শিল্প-সংগীত’।

• অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার ইতিহাস ছিল এক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতাময়। আসলে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলায় কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে স্থানীয় সামন্তপ্রভু ও বর্গীদের দাপট বেড়ে গিয়েছিল। ভারতচন্দ্র ‘মানসিংহ’ খণ্ডে প্রতাপাদিত্য ও ভবানন্দ মজুমদারের কাহিনীর মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও চক্রান্তের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।আর সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল তখন ক্ষমতাবানদের হাতের পুতুল। বর্গীর হাঙ্গামায় গ্রামবাংলার জনজীবন যে কতটা বিপর্যস্ত ছিল, কবি তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা সমাজের বুনন আলগা করে দিয়েছিল।পাশাপাশি-

   • সমাজে দেখা দেয় দেবমহিমার অবক্ষয় ও লৌকিকতা।মঙ্গলকাব্যের চিরাচরিত ভক্তিধর্ম ভারতচন্দ্রের হাতে এসে নাগরিক চাতুর্যে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে দেব-দেবীরা অলৌকিক সত্তা হারিয়ে রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষের মতো ঈর্ষা, কলহ ও কামনায় লিপ্ত। শিব ও অন্নপূর্ণার ঘরোয়া বিবাদ বা ব্যাসদেবের কাশী নির্মাণের প্রচেষ্টায় যে সংকীর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে, তা মূলত তৎকালীন সমাজের মানুষের ক্ষুদ্র মানসিকতারই প্রতিফলন। ঈশ্বরী পাটনীর নৌকায় দেবীর ছদ্মবেশ ধারণ এবং খেয়া পারাপারের ছলে যে বাকচাতুর্য (শ্লেষ), তা ভক্তির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক রসিকতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। আর সেই রসিকতার মধ্যে থেকে উঠে আসে-

    •সমাজের অর্থনৈতিক দৈন্য ও 'দুধে-ভাতে'র আর্তি।আসলে তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ছিল দারিদ্র্যক্লিষ্ট। হিরুক পরিস্থিতির মধ্য থেকে  ঈশ্বরী পাটনীর প্রার্থনায় উঠে আসে-

"প্রণমিয়া পাটনী কহিছে জোড়হাতে।/ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।।"

     আসলে এটি কেবল একটি কাব্যিক চরণ নয়, বরং চরম অভাবগ্রস্ত এক জাতির ন্যূনতম বেঁচে থাকার আকুতি। যেখানে সাধারণ মানুষের অন্নের সংস্থান নেই, সেখানে আধ্যাত্মিক মুক্তি অলীক কল্পনা মাত্র। ভারতচন্দ্র এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    •সমাজের নৈতিক পতন ও হীরা মালিনী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম রূপ ফুটে উঠেছে ‘বিদ্যাসুন্দর’ উপাখ্যানে। হীরা মালিনী চরিত্রটি এই যুগের এক অসামান্য সৃষ্টি। সে চতুর, কুচক্রী এবং অর্থের বিনিময়ে যেকোনো সামাজিক ও নৈতিক অপরাধে লিপ্ত হতে দ্বিধাবোধ করে না। বিদ্যা ও সুন্দরের গোপন প্রণয় এবং তাতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে যাতায়াত-তৎকালীন নাগরিক জীবনের নৈতিক শিথিলতা ও চারিত্রিক পতনকেই সূচিত করে। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়-

"অষ্টাদশ শতাব্দীর কলুষিত নাগরিক জীবনের পঙ্কিলতাই হীরা মালিনীর মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়েছে।"

      •শিল্প-সংগীত ও নাগরিক চাতুর্য অন্যতমঙ্গল কাব্যের প্রাণশক্তি।ভারতচন্দ্র জানতেন সমাজ ভেঙে পড়ছে, তাই তিনি সেই কদর্যতাকে ঢাকতে চাইলেন অলঙ্কারিক কারুকার্য ও ছন্দের ঝঙ্কার দিয়ে। তাঁর কাব্যের ভাষা অত্যন্ত পরিশীলিত ও নাগরিক। আদিরসের আধিক্য এবং শব্দালঙ্কারের প্রয়োগ কাব্যটিকে একটি সুরম্য প্রাসাদের মতো করে তুলেছে। সমাজের অস্থিরতা ও অবক্ষয়কে তিনি এক নান্দনিক রূপ দিয়েছেন, যা প্রকৃতপক্ষে এক ‘শিল্প-সংগীত’। যেখানে সত্যের চেয়ে সুন্দরের বাহ্যিক রূপটিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

     বিচারব্যবস্থার প্রহসন অন্যতমূল কাব্যের জীবন্ত চিত্র।কাব্যের কোটালের বর্ণনা বা সুন্দরের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে তৎকালীন বিচারব্যবস্থার অসারতা ও হাস্যকর দিকটি ফুটে উঠেছে। আইনের শাসন নয়, বরং চাটুকারিতা ও দৈব কৃপাই ছিল বিচারের মাপকাঠি। এটি তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু প্রশাসনিক ব্যবস্থারই এক প্রতিচ্ছবি।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ও রাজসভার পারিপার্শ্বিকতাকে অন্নদামঙ্গলের আধারে সংস্থাপিত করেছেন। তিনি অবক্ষয়িত সমাজকে আদর্শায়িত করেননি, বরং তার নগ্ন রূপটিকে শিল্পের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। মধ্যযুগের ভক্তির শেষ প্রদীপটি যখন নিভে যাচ্ছে, তখন ভারতচন্দ্রের এই কাব্য আধুনিকতার এক নতুন আলো নিয়ে উপস্থিত হয়। তাই ‘অন্নদামঙ্গল’ সমকালীন বাংলার এক ট্র্যাজিক সমাজচিত্রের অত্যন্ত সুচারু ও সুশৃঙ্খল শিল্পায়ন।



Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...