Skip to main content


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমর্থিত শিক্ষার লক্ষ্য,পাঠক্রম ও শিক্ষণ পদ্ধতি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর সিলেবাস )।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন গড়ে উঠেছিল প্রকৃতিবাদ, মানবতাবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের সমন্বয়ে। তাঁর মতে, শিক্ষা কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং বিশ্বের সঙ্গে মানুষের আত্মিক মিলন ঘটানো। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে-

১. শিক্ষার লক্ষ্যঃরবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষার লক্ষ্যগুলি হলো- আত্মউপলব্ধি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর অন্তরের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে পরম সত্তার সঙ্গে যুক্ত করা।আর সেখানে-

  শিক্ষা হল প্রকৃতির সাথে সমন্বয়: কৃত্রিম শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির মাধ্যমেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব।

 * সর্বাঙ্গীণ বিকাশ: শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক এবং আধ্যাত্মিক—সব দিকের সুষম বিকাশই হলো শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য।

 * আন্তর্জাতিকতাবাদ ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব: রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে কেবল জাতীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর কাছে শিক্ষা হলো বিশ্বের সমস্ত মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তোলা। "বিশ্বভারতী" প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এই আদর্শই তুলে ধরেছেন।

২. পাঠক্রম (Curriculum)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বৈচিত্র্যময় ও জীবনমুখী পাঠক্রমের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত পাঠক্রমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল:

 * ভাষা ও সাহিত্য: মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ওপর তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এছাড়া বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য অন্যান্য ভাষার প্রয়োজনীয়তাও তিনি স্বীকার করেছেন।

 * বিজ্ঞান ও প্রকৃতি পাঠ: তিনি বিজ্ঞানমনস্কতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ল্যাবরেটরির পাশাপাশি প্রত্যক্ষভাবে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভূবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার পাঠ দেওয়ার কথা বলেছেন।

 * সৃজনশীল বিষয়: গান, নাচ, অঙ্কন, নাট্যচর্চা এবং হাতের কাজকে তিনি পাঠক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। তাঁর মতে, এগুলি শিক্ষার্থীর সৃজনশীল সত্তাকে জাগ্রত করে।

 * ভ্রমণ ও আঞ্চলিক ইতিহাস: পুঁথিগত ইতিহাসের চেয়ে স্থানীয় ইতিহাস, ভূগোল এবং ভ্রমণের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

৩. শিক্ষণ পদ্ধতি (Method of Teaching)

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষণ পদ্ধতি ছিল গতানুগতিক পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী। তাঁর পদ্ধতিগুলি হলো:

 * প্রকৃতির কোলে শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিশু প্রকৃতির কোলে স্বাধীনভাবে বড় হবে। শান্তিনিকেতনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় এর জীবন্ত উদাহরণ।

 * ভ্রমণকালীন শিক্ষা: তিনি বলতেন, "ভ্রমণকালে শিক্ষা হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।" হাঁটা বা ভ্রমণের সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে কথোপকথন হয়, তা পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী।

 * সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিক্ষা: শিক্ষার্থীর আনন্দহীন পাঠের পরিবর্তে নাচ, গান, অভিনয় এবং সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে শিখবে। একে তিনি 'Ananda Dhara' বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা বলতেন।

 * স্বাধীনতার মাধ্যমে শিক্ষা: শৃঙ্খলা মানে বলপ্রয়োগ নয়। শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের জন্য তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষক হবেন তার বন্ধু ও সহযাত্রী।

মূল্যায়ন ও উপসংহার

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা কেবল আদর্শবাদী ছিল না, তা ছিল চরম বাস্তবধর্মী। তিনি শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে শিক্ষা ও পল্লী উন্নয়নের যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তা আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর ভাষায়, "সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা তাই, যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বিশ্বসত্তার সঙ্গে আমাদের জীবনের সামঞ্জস্য বিধান করে।"

এই নোটটি কি আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য উপযোগী? আপনি চাইলে আমি এই অধ্যায়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেমন 'স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন' নিয়েও আলোচনা করতে পারি।


Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...