Skip to main content

চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো।

'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত' (১৯১১) নাটকটি এমন এক সময়ে রচিত হয়েছিল যখন ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন তুঙ্গে। ইতিহাসের আড়ালে নাট্যকার আসলে পরাধীন ভারতীয়দের হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালাতে চেয়েছিলেন।'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের পরিচয়ে আমরা দেখতে পাই যে-

       বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি মানসে জাতীয়তাবোধের সঞ্চার করতে যে নাটকগুলি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল, 'চন্দ্রগুপ্ত' তাদের অন্যতম। নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ইতিহাসের মৃত কঙ্কালে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তুলেছেন সমকালীন ভারতের পরাধীনতার গ্লানি মোচনের উদ্দেশ্যে। এই নাটকের প্রতিটি ছত্রে ভারতের ঐতিহ্য, শৌর্য এবং অখণ্ডতার জয়গান গাওয়া হয়েছে।আবার সেইসাথে-

         ভারতের রূপ ও ঐতিহ্য বন্দনার দৃশ্য আমরা দেখতে পাই।নাটকের শুরুতেই গ্রিক বীর সেকেন্দারের মুখ দিয়ে নাট্যকার ভারতের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বন্দনা করিয়েছেন। বিদেশি বিজেতার কণ্ঠে যখন ভারতের স্তুতি শোনা যায়, তখন ভারতবাসীর আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। সেকেন্দার মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন-

"একি চমৎকার দেশ! দিনে প্রচণ্ড সূর্য এর গা জ্বালিয়ে দেয়, কিন্তু রাতে চাঁদের আলো একে স্নিগ্ধ করে দেয়।"

      এমনকি তিনি সেলুকাসকে লক্ষ্য করে এও বলেন- "সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!" এই উক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যকার সমকালীন পরাধীন দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে তাঁদের মাতৃভূমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভূখণ্ড।আর সেই ভূখন্ডে

        চাণক্যের অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন উত্থাপিত হয়েছে।আসলে নাটকে জাতীয়তাবোধের প্রধান ধারক ও বাহক হলেন চাণক্য। তাঁর লক্ষ্য কেবল নন্দ বংশের উচ্ছেদ ছিল না, বরং অনৈক্যের ভারতে এক শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি চেয়েছিলেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদগুলোকে একত্রিত করে এক বিশাল 'ভারত সাম্রাজ্য' গড়তে।আর সেখানে চাণক্যকে বলতে শুনি- 

"আমি এমন এক সাম্রাজ্য স্থাপন করব যা হিমালয় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।"

        চাণক্যের এই স্বপ্ন আসলে বিংশ শতাব্দীর খণ্ড-বিখণ্ড ভারতের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে।এরই পাশাপাশি-

       পরাধীনতার যুগে ভারতবাসীকে আত্মবিশ্বাসী করতে নাট্যকার ভারতীয় বীরদের শৌর্যকে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজা পুরু যখন বন্দী অবস্থায় সেকেন্দারের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভীক চিত্তে বলেন-"রাজার প্রতি রাজার ব্যবহার" আশা করেন, তখন ভারতের বীরত্ব ফুটে ওঠে। আবার চন্দ্রগুপ্ত যখন চাণক্যের নির্দেশে গ্রিক শিবিরে অস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমিকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে লড়াই করেন, তখন তা খাঁটি জাতীয়তাবোধের পরিচয় দেয়।আবার সেইসাথে পরিচয় পাই-

      মানবিকতা ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব।নাট্যকার দেখিয়েছেন যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কেবল যুদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তা মানবিকতা ও ক্ষমার ওপর প্রতিষ্ঠিত। গ্রিক হেলেন যখন ভারতীয় শৌর্যের প্রশংসা করে বলেন যে ভারতীয়রা আর্য এবং মহৎ, তখন ভারতীয় সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন হয়। নাটকের শেষে চাণক্যের ক্ষমা এবং মহামতি সেকেন্দারের উদারতা এক মহৎ ভারতের ছবি তুলে ধরে।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকে ইতিহাস কেবল একটি কাঠামো মাত্র। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং পরাধীনতার শিকল ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শক্তিশালী সংলাপ এবং চাণক্যের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব নাটকটিকে একটি নিছক মঞ্চসফল নাটকের চেয়ে অনেক বড় এক 'জাতীয় দলিল'-এ পরিণত করেছে।



Comments

Popular posts from this blog

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর।

দর্শন প্রথম সেমিস্টার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাইনর সিলেবাস)  ১)চার্বাক মতে ভূত কয়টি ও কি কি? উত্তরঃচার্বাক মতে ভূত চারটি- ক্ষিতি, অপ্ , তেজ ও মরুৎ ২) স্বভাববাদ কী? উত্তরঃ চার্বাক জড়বাদের ভিত্তি হল স্বভাববাদ। যে মতবাদ অনুসারে স্বভাব থেকেই ভূত সৃষ্টি, আবার স্বভাব থেকেই বিচ্ছেদ। যার জন্য ঈশ্বরকে স্বীকার করা প্রয়োজন নেই। ৩) অব্যাপ্যদেশ কথাটির অর্থ লেখো। উত্তরঃ অব্যাপ্যদেশ বলতে বোঝায়- অশাব্দ অর্থাৎ যাকে শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। ৫) জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ কাকে বলে?  কোন একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অপর একটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণকে প্রত্যক্ষ করার হয়, তাহলে সেই প্রত্যক্ষকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়। ৬) ন্যায় মতে প্রমাণের প্রকার  উত্তরঃ ন্যায় মতে প্রমাণ চার প্রকার। প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শাব্দ। ৭) সন্নিকর্ষ কাকে বলে? উত্তরঃ ন্যায় মতে ইন্দ্রিয় ও কোন বাস্তব পদার্থের মধ্যে একপ্রকার বিশেষ সম্পর্ক ঘটলে তবেই আমাদের একটি বস্তুর প্রত্যক্ষজ্ঞান ।আর ঐ বিশেষ বিশেষ সম্পর্কের পারিভাষিক নাম হলো সন...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ব্রিটিশ(3rd.Sem) পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর সিলেবাস)।         আমরা জানি যে,ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রভৃতির মাধ্যমে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট আইনানুগ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব নয়। আর সেখানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে আইনানুগ সার্বভৌমত্ব বলা হয়, কারণ-       যেকোনো বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন প্রণনয়নের অধিকারী। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় পার্লামেন্টে কোন আইন প্রণয়নের সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। আসলে সেখানে কমন্সসভা তথা নিম্নকক্ষের সার্বভৌমত্বকেই বলা হয় পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব।     ••ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব বলার কারণ- ১) পার্লামেন্টের ওপর আইনগত কোনরূপ বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না। ২) পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের বৈধতার ব্যাপারে আদালত কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনা। ব্রিটেনের আদালত পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ওপর বিচার বি...