সত্যজিৎ রায়ের বিদ্যালয়ে জীবনের টুকরো টুকরো ছবি যখন ছোট ছিলাম গ্রন্থে যেভাবে ধরা পড়েছে তা অসাধারণ এক জীবনালেখ্য- আলোচনা করো
সত্যজিৎ রায়ের বিদ্যালয়ে জীবনের টুকরো টুকরো ছবি যখন ছোট ছিলাম গ্রন্থে যেভাবে ধরা পড়েছে তা অসাধারণ এক জীবনালেখ্য- আলোচনা করো পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সত্যজিৎ রায়ের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'যখন ছোট ছিলাম' কেবল একজন বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকারের শৈশবস্মৃতি নয়, বরং বিশ শতকের গোড়ার দিকের কলকাতার এক জীবন্ত দলিল। তাঁর বিদ্যালয় জীবনের যে খণ্ডচিত্র এই গ্রন্থে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত সহজ, সরল অথচ প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তিতে উজ্জ্বল। আর সেখানে আমরা দেখি- সত্যজিৎ রায়ের বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে প্রবেশের ঘটনা। যেখানে-
গড়পারের বাড়ি ছেড়ে ভবানীপুরে আসার পর সত্যজিৎ রায়ের প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে। প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন-
"মামা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে এলেন। আমার সে মেজমামার নিজের কোনো ছেলেপুলে ছিল না বলে আমাদের ওপর তাঁর টান ছিল খুব বেশি।"
স্কুলের পরিবেশ তাঁর কাছে প্রথম দিকে কিছুটা অচেনা মনে হলেও ধীরে ধীরে তিনি মানিয়ে নেন। তবে উত্তর কলকাতার তুলনায় দক্ষিণ কলকাতার স্কুলের পরিবেশ তাঁর কাছে কিছুটা আধুনিক এবং পরিচ্ছন্ন মনে হয়েছিল।যেখানে স্কুল জীবনের স্মৃতিতে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সত্যজিৎ রায়ের লেখনীতে তাঁর শিক্ষকদের চেহারা এবং আচরণ খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। বিশেষ করে ড্রয়িং মাস্টার এবং পন্ডিত মশাইদের বর্ণনা তিনি রসিয়ে দিয়েছেন। পন্ডিত মশাইদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন-
"আমাদের পন্ডিত মশাইরা ছিলেন যাকে বলে 'খাঁটি পন্ডিত'। তাঁদের ধুতি, চাদর আর টিকি-সব মিলিয়ে এক প্রাচীন ভারতের ছবি ফুটে উঠত।"
সত্যজিৎ রায়ের সহপাঠী ও টিফিনের সময়ে দেখি-স্কুল মানেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর টিফিনের আনন্দ। সত্যজিৎ তাঁর বন্ধুদের অদ্ভুত সব ডাকনাম এবং তাদের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। টিফিনের সময় স্কুলের গেটের বাইরের খাবার বিক্রেতাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-
"টিফিনের সময় গেটের বাইরে আসত চানাচুরওয়ালা আর আলুকাবলিওয়ালা। তাদের সেই মশলাদার খাবারের গন্ধে মনটা কেমন করে উঠত।"
সব সাধারণ ছাত্রের মতোই সত্যজিতের মনেও কিছু বিশেষ বিষয়ের প্রতি ভীতি ছিল। বিশেষ করে অঙ্কের প্রতি তাঁর ভীতি বা অনীহা তিনি লুকাননি। পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্নপত্র বা কোনো কড়া শিক্ষকের ক্লাসে তাঁর মনের অবস্থা ফুটে উঠেছে নিখুঁতভাবে। তবে ড্রয়িং বা ছবি আঁকার ক্লাসে তিনি ছিলেন রাজার মতো স্বচ্ছন্দ।স্কুলের সরস্বতী পূজা ছিল ছাত্রদের কাছে এক বড় উৎসব। সেখানে প্যান্ডেল করা, ঠাকুর আনা এবং ভোগের খিচুড়ি খাওয়ার যে আনন্দ, তা সত্যজিৎ অত্যন্ত আবেগ দিয়ে বর্ণনা করেছেন। এই অনুষ্ঠানগুলোই তাঁর মধ্যে পরবর্তী জীবনের নান্দনিক বোধের বীজ বুনে দিয়েছিল।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,'যখন ছোট ছিলাম' গ্রন্থে সত্যজিৎ রায়ের বিদ্যালয় জীবন কোনো কঠোর শাসনের গল্প নয়, বরং এক রঙিন কৈশোরের উপাখ্যান। তিনি বড় হয়েছিলেন এক অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে, যার প্রতিফলন তাঁর স্কুল জীবনেও দেখা যায়। তাঁর বর্ণনায় স্কুলের সেই পুরনো বাড়ি, কাঠের বেঞ্চ, কালির দোয়াত আর চকের ধুলো আজও পাঠকদের স্মৃতির গভীরে নিয়ে যায়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDARBON YouTube channel SAMARESH sir
Comments
Post a Comment